কুসুম ও কীট ॥ লুনা রাহনুমা


আঁকা: কাজী জহিরুল ইসলাম

অনেককাল আগে একটি দেশের মাটি নরম বলে সেই দেশের মাটিতে প্রচুর শাক-সবজি, ফলের গাছ, ফুলের গাছ, পাতাবাহার, আসবাবপত্র তৈরির কাঠগাছসহ ইত্যাকার সবরকমের গাছ খুব জন্মাতে লাগল। চাষাবাদ লাভজনক হওয়ায় ও দেশের মানুষগুলো বেশিরভাগ নরম প্রকৃতির হওয়ায় দেশটি ধীরে ধীরে কৃষিপ্রধান দেশ বলে পরিচিতি পেল।

কালক্রমে সেই দেশে মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সবার অলক্ষ্যে ভালোর সাথে কিছু দুষ্ট মানুষও ভিড়ে গেল সেখানে। এই দুষ্ট মানুষগুলোর চোখ থাকত ফুলের দিকে।যেই না ফুল ঝরে গাছে ফল হয়েছে, সেই ফলের দিকে তাদের কুনজর পড়ত সবার আগে।প্রথম প্রথম এই ভয়ানক বদলোকগুলো ভয়ে ভয়ে লুকিয়ে চুকিয়ে একটি দুটি পুরুষ্ট পাকা ফল নষ্ট করল।তারপর তারা দেখল কেউ তাদেরকে শাসন করছে না।তাদের দিকে কোদাল, নিড়ানি, কাস্তে হাতে তেড়ে আসছে না।তাই সাহস বেড়ে দুষ্ট এই মানুষগুলো একেকটা হয়ে উঠলো সাক্ষাৎ নরকের যম।

প্রথমদিকে বাগানীরা সমাজ প্রধানের কাছে নালিশ করলেও কেউ খারাপ লোকগুলোকে কোনো শাস্তি দিলো না।চৌরাস্তার মোড়ে প্রকাশ্যে তরতাজা গোলাপ হত্যার দায়ে তাদেরকে ফাঁসি দেওয়া হলো না।তাই লোকগুলো একসময় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠল।এখন তারা আর কেবল পুরুষ্ট ফল আর ফুটন্ত গোলাপকেই খোঁজে না। তারা এখন অসুস্থ মানসিকতা নিয়ে কচি অপরিপক্ক কষটে ফুল ফল যাই পায়, সবকিছু তাদের নোংরা নখের আঁচড়ে ক্ষত বিক্ষত করে দিতে থাকে কুৎসিত উল্লাসে।

এই দানবদের অত্যাচারের কারণে চাষী তার ভালোবাসা আর যত্নের সাথে একটু একটু করে বড় করা ফুল ফল বৃক্ষের কোনো অংশই আর অক্ষত রাখতে পারছিল না সেই দেশে।উপায় অন্তর না দেখে আর লোকমুখে শুনেশুনে তাদের ধারণা বদ্ধমূল হলো যে বাগানে বা গৃহকোণে রং ছড়ালে পতঙ্গের আক্রমণ হওয়া প্রকৃতির নিয়মের মতোই স্বাভাবিক। এই আক্রমণ ঠেকানোর উপায় তাদের জানা ছিল না।জানা থাকলেও তা বাস্তবায়নের সাহস ছিলো না।

অতঃপর তাই সেই দেশের চাষিরা দিনে দিনে চাষবাস করা কমিয়ে দিলো।বাগানীরা তাদের বাগান সংকীর্ণ করে ফেলল।ক্ষুধার্ত শুঁয়োপোকার হাত থেকে ফুল, ফল আর ফসল রক্ষা করতে গিয়ে একদিন দেখা গেলো সেই সবুজ শ্যামল দেশটিতে সবুজের খুব অভাব পড়ে গিয়েছে। রঙিন ফুলেরা আর দুলে ওঠে না পথে প্রান্তরে। গোলাপ শোভা পায় না আর কারো বাড়ির সামনে কিংবা পিছনের বাগানে।পাখি আর পাকা লাল-পেয়ারা অর্ধেক খেয়ে অর্ধেক ফেলে রাখে না গাছের পাতার ফাঁকে। মাঠের পর মাঠ লজ্জাবতীরা আগের মতো দুই বাহু বাড়িয়ে অপেক্ষা করে থাকে না কখন ঘাসফড়িং এসে ছোঁয়াছুয়ি খেলবে তাদের পেলব পাঁপড়িতে।লজ্জাবতীরা সবাই এখন মুখ বুঁজে পড়ে থাকে অশনি সংকেতের মহাআতঙ্কে।

দুঃসময়ের চরম মুহূর্তে দুষ্টের দমন করার চিন্তা করেনি সেই দেশের মানুষেরা।সেই দেশের মানুষদের নেতারা কেউ সৎ আর সাহসী হয়নি সমাজ আর পরিবেশ উন্নয়নে।দনুর পুত্রের বিষদাঁত আর করাল থাবা সজোরে প্রতিহত করতে পারেনি তারা সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।বরং সেই দেশে সবাই আঙ্গুল তুলে দুষেছে কোমল ফুলের পাপড়িগুলোকেই।অভিশাপ দিয়েছে বাগানীদের, তাদের অমন আকর্ষণীয় ফসল লোকচক্ষু সম্মুখে ফুটেছিল বলে।মানুষগুলো তাদের স্বচ্ছ দৃষ্টির সামনে থেকে সাদা সরল পথকেও গায়েবি জানাজা পরিয়ে দিয়ে ঢেকে রাখলো মৃত্যুকূপের গভীর অন্ধকারে।তবু বেশিরভাগ মানুষ সাহস সঞ্চয় করতে পারলো না একটি প্রতিবাদ শব্দ উচ্চারণ করতে।একটিবার উচ্চস্বরে বলতে: “গোলাপকে ফুটতে দাও আপন মনে। গোলাপকে তোমরা দোষ দিয়ো না তার রূপ আর যৌবনের কারণে। বরং নোংরা কাজে প্রবৃত্তি যার, শুধরাও সেই পাপিষ্ঠকে।অনঙ্গ অপ্সরা একেকটি গোলাপের কোমল তনু স্বর্গের অংশ এই ধূলার পৃথিবীতে।নষ্ট করে যে হাত তাদেরকে; অসুর সেই হাত, সত্বর ঠেকাও তারে!”