পায়ে চলা মাছ ॥ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ


পায়ের ওপরে ভর দিয়ে চলা মাছগুলোর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে। পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরালিওনের রাজধানী ফ্রিটাউন থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিনে গডরিচ নামক সৈকতের পাশের জেলেপাড়ায় একটা কাঠের সাঁকোর নীচে।

গড রিচের কঙ্করময় কন্টকাচ্ছাদিত মাঠে ব্যানসিগ২ এর সদরদপ্তর। আটলান্টিক মহাসাগরের বেলাভূমি থেকে মাত্র ২০০ গজ পশ্চিমে। বাংলাদেশ থেকে জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া বাঁশ, কাঠ আর টিন দিয়ে তৈরী করা হয়েছে সৈনিক লাইন, মসজিদ, অফিসকক্ষ-সবই।লাল ধূলিধূসরিত একটা রাস্তা বেলাভূমির সমান্তরাল ইউনিটের সামনে দিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। রিভার-২ নামক সাদা বালির সৈকত পর্যন্ত। লেবানিজ মেয়েদের উচ্ছলতায় ভরে থাকে যেখানকার সকাল-দুপুর-বিকেল।

ইউনিটের পশ্চিম পাশে রাস্তার ধারে সবুজ বনের পাহাড়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর মতো সারি সারি। পাহাড়গুলোর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে বিভিন্ন উচ্চতায় ঘরবাড়ি।যারা যত বেশী সামর্থবান, তাদের বাসস্থান ততবেশি ওপরের দিকে।

পাহাড়ের অন্তঃস্থল থেকে একটা খাল পেনিনসুলার রাস্তার ওপরের সাঁকোর নীচ দিয়ে গডরিচ জেলেপাড়ার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে মিলেছে। রাস্তা থেকে সাধারণভাবে এই খালের অস্তিত্ব বা উৎস কোনটাই দৃশ্যমান নয়। তবে সাঁকোর কাছে দাঁড়ালে সারাক্ষণ জল পড়ার শব্দ শোনা যায়। জলপ্রপাতের অবিরাম শব্দের মতো। প্রতিনিয়ত জোয়ারভাটা হয় এই খালের ভেতরে। সমুদ্রের সাথে গভীর আত্মীয়তার কারণে।

প্রতিদিন সকালের মোহন আলোতে প্রতিনিয়ত আমরা সমুদ্রকে অবজ্ঞা করে পেনিন সুলার রাস্তা দিয়ে হাঁটাহাঁটি বা দৌড়াদৌড়ি করি। আজ আমি ক্যাপ্টেন হাসিবকে সাথে নিয়ে এসেছি জেলেপাড়ার দিকে। গডরিচ বীচের সমান্তরালে প্রবাহিত একটা মাটির রাস্তা দিয়ে। জায়গাটা শহরতলীর মতো দেখতে। চারপাশের একতলা টিনের ছাঁদের ঘরগুলো অদ্ভুত রকমের সুন্দর। যুদ্ধের আগে সম্ভবত রিসোর্ট অথবা হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখন স্থানীয় অধিবাসীরা দখল করে নিজেদের বাসস্থান বানিয়েছে। ভেতরের দিকে একটা গির্জা। গির্জার দেয়ালে আঁকা মেরীর কোলে যিশু। রিলিফ উয়ার্ক। দুজনের গায়ের রঙই কালো। তাদেরকে ঘিরে আকাশের ভেতরে পরীর পাখা নিয়ে উড়তে থাকা দেবদূতদের রঙও। জীবনে এই আমরা কালো রঙের মেরী আর যীশু প্রত্যক্ষ করলাম।

গডরিচ বীচের পার্শ্ববর্তী রাস্তাটা যেখানে শেষ, সেখান থেকে একটু উত্তরে দুই বাড়ির মধ্য দিয়ে সরু রাস্তা। এই পথে একটু এগোতেই সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত খালটির ওপরে একটা কাঠের সেতু। এটা সেই খাল যা পেনিন সুলার সড়কের নীচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলেপাড়ায় যেতে হলে এই খাল পার হয়েই যেতে হয়।

ভাঁটার সময়। সাঁকোর নীচের পানি সমুদ্রের দিকে নেমে গেছে। কর্দমাক্ত মাটি। জলকাদায় একাকার। সাঁকোর ওপর থেকে আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম টাকি মাছের মতো দেখতে উভচর প্রাণী স্বচ্ছন্দে কাদামাটির ওপরে হাঁটাচলা করছে। আনুমানিক ছয় ইঞ্চি দীর্ঘ। চোখ দুটো ব্যাঙের মতো দেহের বাইরে। অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে সাঁকোর ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদেরকে অপলক নেত্রে দেখছে!

আমি বিস্মিত ও মুগ্ধ। একটা অসীম কালের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের সুতো দুদিক থেকে টেনে টেনে আমাদের মাঝখানের দূরত্বকে ঘুচিয়ে দিতে চাইছে আত্মীয়ের মত! মূহুর্তের ভেতর আমার মনের মধ্যে ভাবনা এলো,’জল থেকে স্থলের দিকে মানুষের অনন্ত যাত্রা তা কি এভাবেই শুরু হয়েছিল?’