ইদ্রাকপুর কেল্লায় একদিন ॥ মনিরুল ইসলাম


চলেছি নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পুরানো পথ ধরে। বুড়িগঙ্গাকে ডানপাশে রেখে ফতুল্লা হয়ে বয়ে চলেছে পথটি।কত বছর পর এই পথ ধরে চলেছি স্মৃতি হাতড়েও বের করতে পারলাম না।

উদ্দেশ্য মুক্তারপুর ব্রিজ পার হয়ে মুন্সীগঞ্জ যাওয়া।মুক্তারপুর ব্রিজ ও মুন্সীগঞ্জ শহর দুটোই আমার কাছে নুতন, আগে যাওয়া হয়নি।মুন্সীগঞ্জের আদি নাম বিক্রমপুর, যা ছিল প্রাচীন বাংলার রাজধানী।পথ শেষ করে যখন শহরে থামলাম,তখন সকাল নয়টাও বাজেনি।দোকানপাট ঠিকমতো খুলেনি।যেখানটায় আমাদের গাড়ি থামলো তার বাম দিকটায় ইদ্রাকপুর কেল্লা আর ডান দিকটায় ডিসি পার্ক।

ডানের পথ ধরে একটু এগুলোই ইদ্রাকপুর কেল্লার প্রবেশদ্বার।কাছে গিয়ে জানতে পারলাম সকাল দশটার আগে প্রবেশদ্বার খুলবে না এবং দশ টাকার টিকেট নিলে তবেই মিলবে প্রবেশ অনুমতি। হাতে একঘণ্টা উদ্বৃত্ত সময়। নাস্তা ও খবরের কাগজ নিয়ে বসলাম উদ্বৃত্ত সময়টুকু ব্যবহার করার জন্য।

কাছেই কাচারি মোড়ে চিত্ত বাবুর দোকানে নাস্তার অর্ডার দিয়ে বসলাম। যে হকার ভাইয়ের থেকে প্রথম আলো কিনেছি উনি স্থানীয় একটা দৈনিক সংবাদ পত্রিকা মুফতমে ধরিয়ে দিল।ভাইয়ের সাথে কথা বলে জানা গেলো এখন আর কেউ বাসায় খবরের কাগজ রাখে না বললেই চলে, ব্যতিক্রম শুধু কিছু অফিস আদালত।চা শেষ করতে করতে ঘড়ির কাটা দশটা ছুঁয়ে ফেললো, টিকেট কেটে প্রবেশ করলাম কেল্লার ভেতরে।এখানকার লোকজন দুর্গটিকে কেল্লা বলতেই পছন্দ করেন।শহরের কাছেই ইদ্রাক পুর নামে গ্রাম আছে।স্থানীয়দের কাছে কেল্লা শব্দটি উচ্চারণ না করলে পথ দেখিয়ে কেল্লার বদলে গ্রামে নিয়ে হাজির করবে ।

১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাঙ্গালার সুবেদার মিরজুমলা এই দুর্গটি নির্মাণ করেন।রাজধানী ঢাকা নগরীকে মগ, পর্তুগিজ ,আরাকানি ও অন্যান্য জল দস্যুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য ইছামতি নদীর তীরে এই দুর্গটি নির্মাণ করেন।যদিও বর্তমানে নদী গতিপথ বদলে অনেক দূরে সরে গেছে।আগে ছিল পশ্চিম পাড়ে ইদ্রাকপুর কেল্লা আর অপর পাড়ে হাজীগঞ্জ কেল্লা।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দায় আরও একটি জল দুর্গ আছে।সবগুলোই নির্মাণের উদ্দেশ্য ঢাকাকে নৌ আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য।আবুল হোসেন ছিলেন দুর্গের নৌ-সেনাপতি সদলি খান ছিলেন স্থল বাহিনীর প্রধান।

দুর্গটির সম্পূর্ণ অবয়ব আর অক্ষত নেই, কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। তবে প্রধান অংশটুকু এখনো অক্ষত আছে যা দেখলে সহজেই বোঝা যায় এখানে একটা দুর্গ ছিল।দুর্গের পূর্বদিকের আয়তকার অংশের চার কোনে প্রাচীর সংলগ্ন বৃত্তাকার ও ছিদ্রযুক্ত চারটি বুরুজ রয়েছে। দুর্গটির মাঝে পশ্চিম অংশে ইটের তৈরি একটি উঁচু বৃত্তকার পর্যবেক্ষণ বুরজ আছে এবং এটাই এখন দর্শনীয় স্থান।ধারণা করা হয়, এই বুরুজ পূর্বে আরও উঁচু ছিল, এর উপর থেকে প্রহরীরা শত্রুপক্ষের রণতরীর আনাগোনা পর্যবেক্ষণ করতো।ইদ্রাকপুর দুর্গের সমগ্র বেস্টনি প্রাচীর, কোণের বুরজসমূহ এবং পর্যবেক্ষণ বুরজের উপরের অংশে নানা প্রকার ছোট বড় ছিদ্র রয়েছে।এই ছিদ্রগুলো কামান থেকে গোলা নিক্ষেপ, বন্ধুক স্থাপন, অথবা তীর ছোঁড়ার কাজে ব্যবহৃত হতো।পর্যবেক্ষণ বুরজের দক্ষিণ পূর্ব কোনে একটি গুপ্ত সিঁড়িপথ নীচের দিকে নেমে গেছে।আত্মরক্ষার প্রয়োজনে হয়তো এই পথটি রাখা হয়েছিলো।

এছাড়াও এখানে আরও একটি গুপ্ত পথ আছে।পর্যবেক্ষণ বুরুজের প্রবেশদ্বারের বা দিকে গুপ্ত পথের মুখটি দেখা যায়।প্রচলিত আছে এই গুপ্ত পথ ধরে হাজীগঞ্জ বা সোনাকান্দা এমনকি লালবাগ দুর্গেও যাওয়া যেত।যদিও তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।গুপ্ত পথ আছে এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই, তবে সন্দেহ হলো কতদূর যাওয়া যেত তা নিয়ে।অনেকের ধারণা, এ গুপ্ত পথটি দিয়ে অন্য কোনো দুর্গে যাওয়া না গেলেও ধলেশ্বরী বা ইছামতি নদীর কোথাও হয়তো বেড় হওয়া যেত।

ব্রিটিশ আমল থেকেই দুর্গটিকে সরকারি কর্মকর্তাদের বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করা হতো।এখনো পুকুরের পশ্চিম পাড়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কিছু লোকের বসাবাস আছে।তবে পর্যবেক্ষণ বুরজের ভিতরে এখন আর কোন স্থাপনা নেই। দুর্গের দক্ষিণে ব্রিটিশ আমলে তৈরি পুরানো জেলখানা রয়েছে, যদিও এখন যাদুঘর হিসেবে ব্যবাহার করা হয়।এখানে অনেক কিছুর সাথে দুর্গের ভিতরে পাওয়া ছোট ছোট কলশী রক্ষিত আছে ।
এগুলো পাওয়া গিয়েছে পর্যবেক্ষণ বুরুজের মেঝেতে।এ সম্পর্কে বিভিন্ন মতো প্রচলিত আছে।কেউ কেউ বলে থাকে এগুলে ব্যবহার করে শীততাপ নিয়ন্ত্রণ অথবা ভূমিকম্প রোধ করা হতো।অন্য প্রচলিত মতো অনুযায়ী, যেহেতু এগুলো বালি ভর্তি অবস্থায় পাওয়া যায়, আক্রমণ হলে দুর্গের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যেন কম হয় এই কারণে ব্যবহার করা হতো। মানুষের অসচেতনাতার সাথে যুদ্ধ করে মোগল আমলে বাংলায় নির্মিত এই স্থাপত্য ইতিহাসের পাঠ হিসেবে আর কতদিন টিকে থাকবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।