প্রতিকল্প ॥ ইসমত শিল্পী


১.

প্রত্নতাত্মিক ভিড়ে
যতক্ষণ ঘাসের চিহ্ন ধরে রাখে সবুজ পাহাড়,
ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি থাকো

কুয়াশায় বৃষ্টির চিহ্ন ডুবে যাবে
রোদের সোনালী আভায় হেসে উঠবে বাড়ির ছাদ
আমাদের দেখা হবে টুপটাপ হলুদ সন্ধ্যায়

ত্রিভুজ সংসার ছেড়ে পতিতা সময়
অজানা ভবিষ্যৎ আঁকে রোজ
পরবর্তী ঋতুর সাথে মিলিত হয় দুপুর
নতুন প্রমিকের মতো হাসে ধ্রুপদ বিকাল

বেলা পরে এলে আকাশের সাথে দেখা হয়
প্রত্নতাত্মিক ভিড়ে ছায়াও ছাড়েনা ছায়াকে

২.
হিমালয় থেকে দূরে সরে এলে ফিরে দেখতে নেই পাহাড়।তাতে দুঃখ বাড়ে। রামধনুর দিকে তাকানো যত আনন্দের পাহাড়ের দিকে ততটা নয়।পাহাড় বরাবরই দুঃখময়।সবুজ ঘাসের মাঝেও দুঃখের সুর, কারণে অকারণে।ওদিকে এগোতেও ভয় হয়।

শরীরের রক্তে কপালে টকটকে টিপ আঁকলে সিঁদূর ভেবে ফেলে; কলরব তোলে লোক, হাততালি দেয় বিদ্রুপ।ভ্রু জোড়ার ফ্যাকাসে অস্তিত্ব পুরু কাজলে ঢেকে নেওয়া অতোটা সহজ নয়।যতটা পুকুর কিংবা নদী হওয়া।অথবা ঘাস।
ঘাসের বুকের সাথে জমানো উত্তাপ।ভুল করে কতবার পুড়িয়েছি জল। তাকে অশ্রুবিন্দু বলিনি বলেই বোঝেনি কেউ।সবার উচ্চারিত ভাষা তো একরকম নয়।কেউ কেউ নদীর জলেও সমুদ্রের লবণ চেখে দেখে।সেটাই কি ঠিক? কেউ-বা সমুদ্র বুকে নিয়ে কাটালো জীবণ।রক্ত নিংড়ে রাঙালো কপাল, দুঃখের কাজলে চোখ।তাকে সুখ ভেবে নিলে; সেটা ই কি ঠিক?

ঘাস অথবা পাহাড়ে যাবার ইচ্ছে ভয়ে নিংড়ে নিয়েছে দৃষ্টি।চোখ বন্ধ করলে অনেক বেশি দেখা যায় তাই বন্ধ চোখে সবটুকু দেখা হয় মনে মনে। অথচ মন তো অচল পয়সা ! পুরোনো সিন্দুকে মাপে মাপে বসে গেছে বেশ।এসবের কানাকড়িও দাম নেই।

যার কোনো দাম নেই তাকে বোঝানোর দরকারই বা কি!
হিমালয় থেকে দূরে সরে এলে ফিরে দেখতে নেই পাহাড়।তাতে দুঃখ বাড়ে

৩ .

আপনাকে কোনোদিন জানানো হবে না
সময়ের সঙ্গে বায়ুশূন্য শব্দের প্রেম

পূর্ণিমা উপছে পড়া চাঁদে এলিয়েনের ছায়া
গাছের সংসার
আপনাকে জানানো হবে না, আমাদের পরিচিত মেঝেতে মৌনতা ছবি আঁকে অন্য কারোর

দেখার সাথে দৃষ্টির পার্থক্য কতটা কঠিন, জানানো যাবে না!

আপনি সব জানতেন
তাই
কিছুই জানানো গেলো না!

৪.
প্রিয় কিছু খুঁজে পাইনা এখন
হাত পা, হাতের আঙুল, নখ
অথবা কপাল
চোখ ও চোখের জল

ধুলোয় ধুলোয় মৃত্যুমিছিল
শূণ্যতায় শব্দ ছুটে আসে

রোদহীন শীতের সকাল
নখের ভিতরে বরফের জীবন
হঠাৎ চিঠি আসে
খামের ওপর অজানা ঠিকানা
ভেতরে আমার নাম

রোদ হারিয়ে যাচ্ছে
আমার একমাত্র প্রেমিক-রোদ

৫.
শেষ ট্রেন ছেড়ে দিলে আর কোনো অপেক্ষা থাকে না। কুয়াশামাখা ভোরের অপেক্ষায় রাতের সাথে বাধ্য হয়ে সখ্য গড়ে তুলতে হয়।নিজের সাথে গল্প করতে করতে একাই হাঁটতে শুরু করি, ওমাথার ধোঁয়া ওঠা চায়ের দোকানে বসবো বলে। দোকানের সামনে একটা কাঠের বেঞ্চিতে কজন লোক।পাঁচ জনের স্থানে ছয়জন ঠাসাঠাসি করে বসে। চায়ের সাথে বিড়ি টানছে কয়েকজন।

একজনের ঠোঁট দুটো চেপে আছে সিগারেটে।এক পা তুলে হাঁটু মুড়ে বসে, ডান হাতে চায়ের কাপ।কাপ নয়, কাচের গ্লাস।
কাচের গ্লাসে চা খেতে দারুণ লাগে।খুব ইচ্ছে হচ্ছিল এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ি।নাহ্ ওই বেঞ্চিতে বসার জায়গা নেই।দাঁড়িয়ে চা খেতেও খারাপ লাগে না।সূর্যটা বেশ রং ছেড়েছে; কমলা রঙের রোদ।

এগিয়ে যাচ্ছি ওদিকেই।সিগরেট খাওয়া লোকটি হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। পায়ে এ্যাশ কালার স্যান্ডেল।এই শীতে স্যান্ডেল?
এ্যাশ আমাকে ভীষণ টানে।লোকটার পাজামা-পাঞ্জাবি বেশ পুরোনো। অগোছালো, এলোমেলো চুল।রাত-জাগা চোখ।কিন্তু এ্যাশ রঙের স্যান্ডেলে বেশ পরিচ্ছন্নতা।ক্রমেই আমাদের দুরত্ব কমছে।অগোছালোর ছায়া আমার ছায়ার কাছে ভিড়ছে।এ্যাশ রঙের স্যান্ডেল লম্বা পায়ে এগিয়ে আসছে।আমি আর এগোতে পারছি না।

রোদের কোনো শব্দ হয় না।এখনো নেই।ট্রেনের শব্দের অপেক্ষা আর তীব্র অনুভব আমাকে পীড়া দিচ্ছে।
– কখন আসবে ট্রেন?
– আজকের সব ট্রেন চলে গেছে।কালকের জন্যে অপেক্ষা! কীভাবে?
ছায়াটি এগিয়ে এলো? নাকি পাশ কাটিয়ে চলে গেলো!
আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।তীর্যকভাবে পেছন ফিরে আমি ছুটছি। এ্যাশ রঙের স্যান্ডেল, আর রাত-জাগা মানুষ এভাবে আর কখনোই যেনো দেখিনি আমি!

৬.
তুমি কথা বললেই,
চাঁদের সিঁড়ি টপকে মহাকাশ ছুঁতে পারি
মহাকাব্য হতে পারে এজীবন
অথচ আংশিক শব্দের সাথে
থেকে যাও বর্ণিল সাজে
আংশিক রেখার উপরে হেঁটে কতদূর
যাওয়া যায় বলো, জ্যামিতিক ভাষায়!
শুধুমাত্র কথার শব্দে গাঁথা যায় না সময়

৭.
বারবার ভুল পথের টিকিট করে ফেলি
যাত্রার সময় পেরিয়ে যায়
যাত্রা ও অভিযাত্রায় শৃঙ্খলিত পথ
লাভার উপরে লাভার পলেস্তারা
তবু যেতে হয়!

পা বাড়ালেই পথ শেষ হবে এমনও নয়
অথচ
কতবার কথা হলো! পথের কথা, জলের কথা
কাদামাটি, পাখির কথা
তবু
উদ্দেশ্যহীন থেকে গেলো আগামী সৌহার্দ্য!

দৃষ্টিতে ভাইরাস ভাসে বলেই গন্তব্য ভোলে পথ
নকল শব্দ ছড়ানো মাঠে প্রান্তরে
পাখিরা হারায় নিয়ম
নদীরাও আত্মহত্যা করে
বৃষ্টিপাতের হাটে

৮.
তোমার পায়ের তলায় ছড়িয়ে দেওয়া আমার কিছু ফুল ছিল,
ভুল ছিল
তোমার হাতের মুঠোয় পিষ্ট হওয়া রোদের কিছু ফুল ছিল,
ভুল ছিল।

মেঘের দেশে যাবো বলে মন ছিল
বৃষ্টি শেষে গাছগুলো সব দুলছিল
আমার তোমার হাতের ভিতর ইচ্ছেগুলো উড়ছিল
ভুল ছিল!

সিঁদুর রঙা উঠোন জুড়ে কাঠাল পাতার রঙ ছিল, রোদ ছিল
আয়না ভাঙার শব্দ শুনে কাঁঠাল চাপা কাঁদছিল,
শূণ্য আঁচল তোমার হাওয়ায় ভুলের ভিতর দুলছিল,
ভুল ছিল!

জন্ম সখা, বিষুবরেখা
যাবজ্জীবন ফিরে দেখা
আয়ুর ভিতর নাভির মরা
চোখের জলে জৈষ্ঠ্য খরা

নাড়ির টানে ভুল আলোকে হৃৎ কাঁপানো মৌমাছিরা ঘুরছিল,
ভুল ছিল!

আবার যখন দেখা হলো-
বাঁচার কথা বলতে গিয়ে শব্দগুলো অজস্রবার পুড়ছিল,
ভুল ছিল!
তোমার হাতের ভিতর ইচ্ছেগুলো অ-কারণে পুড়ছিল
ভুল ছিল!

৯.
দূরে থাকো, তবু থাকো

বিষের কৌটায় মোড়ানো আঁধার
রক্তদহের স্রোতে ভাসে হারানো সুন্দর
বিস্তৃত সুর
মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ঝুলে থাকা জল
পুরনো পচন থেকে ঘন ঘন শ্বাস নেয় রোদ
বিনোদন পূর্ণ পতিতা প্রেমিক গান গায় দূরে
রাতের আঁধারে!

বারোয়ারি রাজারে দূরের মানুষ
আসে, যায়
দূরেই থাকো, অমৃত সুন্দর।

১০.
সূর্য ওঠেনি
শ্রাবণের জলে নিস্তেজ সকাল
একাকীত্বের সূর
অপেক্ষার ঘরে আচ্ছন্ন বাসন
ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে
অথচ
তুমি কথা বললেই তীব্র উল্লাস জমা হয়
বেঁচে উঠি মহুয়াঘ্রাণে
রোদের রঙ ধরে বাদামি ঘর
তুমি কথা বললেই
পৃথিবী জুড়ে অকৃপণ হাওয়া ভাসে
হীম সময়ে স্রোত আসে, উল্লাসে
তুমি কথা বললেই
রক্তগন্ধা নদী ভরে ওঠে জলে
স্রোতের সাথে ভাসে প্রেম!
তুমি কথা বললেই
এর চেয়ে ঢের বেশি ভালো থাকা যায়
বলো না কেন?