কয়েক টুকরো অপরাধ-চিত্র ॥ শামসুল কিবরিয়া


অলঙ্করণ: লংরিড

মাঝে মাঝে অপরাধবোধ খুব তীব্র হয়ে ওঠে মনের কোনে।ফেলে আসা সময়ে হয়তো নিজের অজান্তেই কোনো অপরাধ করা করা হয়ে গেছে। যা কখনো প্রকাশিত হয়নি, যা পরবর্তী সময়েও নিজের মনই কেবল জানে। এই অপরাধ বা অপরাধসমূহ যখন কোনো নিভৃতে মনে ভেসে ওঠে, অপরাধ সংঘটনের সময়ে যা অপরাধ বলে মনে হয়নি, যার জন্য বড় কোনো বাহ্যিক ক্ষতিও হয়নি, যা কেবল নিজেকেই রক্তাক্ত করে দিনের পর দিন, তখন কী তীব্রভাবে আলোড়িত হয় মন?

কেন এমন করতে গেলাম? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নাই।মন কেন অপরাধ সংঘটনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল? এর কোনো যুক্তি নাই। কোনো এক ঘোরের বশে হয়তো এটা ঘটে গিয়েছিল।এর কোনো কার্যকারণ নাই, এর কোনো পরম্পরা নাই। তবে এর এমন এক তীব্রতা থাকে যা বয়ে চলে নিরবধি।এর ফলে বর্তমান বিতৃষ্ণ হয়, কখনো কখনো হাহাকার তীব্র হয়ে ওঠে।

এই বোধ বর্তমানকে বিষ-জর্জর করে দেয়।স্বাভাবিকতার ভেতর হাজির করে অস্বাভাবিকতা।আরাম কেড়ে নেয়, মাঝে মাঝে ঘুম কেড়ে নেয়। কেড়ে নেয় জীবনের নান্দনিক অনুভব।আমার ভেতর থেকে বের করে হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয় দৈনন্দিতার নানা অনুষঙ্গ।অবাক হয়ে তখন ভাবতে হয় জীবন এভাবেও চলে! আর চলবেই না কেন? জীবনের ধর্মই তো এগিয়ে যাওয়া।সবকিছু মাড়িয়ে কেবল এগুতে থাকা।কোনো কিছুর জন্যই তার থেমে থাকার অবকাশ নাই।যত ঝড় আসুক, যত প্রতিকূলতা আসুক-জীবন এগিয়ে যাবেই সামনের দিকে।

তবে কেন ফেলে আসার দিনের কোনো এক অপরাধ সংঘটনের দায়ে নিজেকে ক্রমাগত অভিযুক্ত করা? এরকম তো হতেই পারে বা হচ্ছেই তো নিয়ত, যা আমি করতে চাই না, তা করতে হচ্ছে আমাকে।আর অজান্তে তো কতো কিছু ঘটছেই।তাহলে কেন আমাকে অপরাধের দায় নিতে হচ্ছে? কেন আমাকে আমারই বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।অথচ এটার জন্য আমার কোনো দোষ ছিল না, কোনো ইচ্ছাই ছিল না নিজেকে কোনো অপরাধ সংঘটনের দিকে ধাবিত করার।

তবু আমি কুঁকড়ে যাই, শামুকের মতো গুটিয়ে যাই কখনো কখনো, আমার ব্যক্ত হবে এমনকিছু অব্যক্ত থেকে যায়।আমার স্বাভাবিক ছন্দ কেটে যায় বা আমি নিজেই কেটে দেই নির্মম যন্ত্রণা ভোগের কারণে।

বিষণ্ণ সন্ধ্যা তখন আমার খুব ভালো লাগে।নিজেকে মিশিয়ে দিতে ইচ্ছা হয় আলো-আঁধারির বিমর্ষতার মাঝে।

পথ চলতে গিয়ে পিছলা খেয়ে পড়া লাগতে পারে।কে জানে সামনে পথের কিছু অংশ পিচ্ছিল হয়ে আছে? যদি এটা জানাই থাকতো তাহলে তো এ অংশটা সাবধানে যাওয়া যেতো।কিন্তু জানা না থাকলে কী করা? এক্ষেত্রে দুটোই হতে পারে-পিচ্ছিল অংশটা অবলীলায় পার হওয়া যেতে পারে, অথবা পিচ্ছিল অংশে পা দিয়ে ধপাস করে পরে যাওয়া লাগতে পারে। এতে ব্যথা তো কিছু লাগবেই।উল্টাপাল্টা পড়ে গেলে আবার ব্যথার তীব্রতা বেশি হয়।অথচ এভাবে পড়ে যাওয়ার জন্য নিজের কোনো দায় ছিল না।তবু এই অপরিহার্যতাকে এড়ানো যায়নি।এড়ানো যায়নি আঘাতপ্রাপ্তিকে।

সামনে কোথায় কী ওৎ পেতে আছে কে জানে? কার দ্বারা কখন কী ঘটে যাবে এটা জানা নাই।জানা নাই অন্ধকার না আলো-কোনটি বিপদ বয়ে আনবে।কিন্তু এর ফলাফল যে কতটা ভয়াবহ হয়ে ওঠতে পারে ব্যক্তিবিশেষের জন্য তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অতঃপর, আবারও আমি দোষারূপ করি নিজেকেই।নিজের দ্বারা সংঘটিত অনেক অপরাধের জন্য যদিও আমি দায়ী নই তবু আমাকে দাঁড় করাই আমার বিরুদ্ধে।নিজেকে খনন করতে উন্মুক্ত হই নিজেরই সামনে।আমি কে? এটা কী আমারই চেহারা? আমিই কী আসলে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে? আমার ভেতরের কোলাহল কী আমাকেই প্রতিধ্বনিত করছে? বুঝতে চাই। তবু বোঝা হয় না। আবারও বুঝতে চাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে মন আর চোখ ফেলে রাখি। হবে কী তা কখনো? পারবো কী অপরাধের প্রকৃত কারণের সাথে কোনো বোঝাপড়া করতে?