সাদা কার্বন (পর্ব-১০) ॥ ইসমত শিল্পী


চিত্রশিল্পী: কাজী জহিরুল ইসলাম

বিষাদের স্তরগুলো পুরোনো কাঁঠের মতো পোক্ত হয়ে ওঠে আজকাল। ক্রমেই ভারি হয়, আটকে ধরে গলা।অথচ কী অবলিলায় হেসে উড়িয়ে দিতে চেয়েছি জীবন! পোড়া কাঠের কয়লার স্তুপে বসেও হাসা যায়; বিষাদকে মামুলি ভেবেই হেসেছি। সে হাসির মর্ম হাসিই জানে, আর কেউ নয়।সবকিছুর মর্ম সবাই জানবে এমন তো নয়! জানবার দরকারই বা কি? অথচ এইসব মামুলি বিষাদ পুরো জীবনকে গিলে খাচ্ছে।ইদানিং সারাক্ষণ মগজে আটকে থাকে কিছু প্রতারণার দৃশ্যচিত্র।অনেক দৃশ্যই এড়িয়ে চলার আগ্রাণ চেষ্টা করি। এখন যেনো কিছুই পারি না।শক্তির শক্তি ক্ষয় হয়- এ তো আমরা জানিই।

রাতের দীর্ঘশ্বাস ভারি হয়, বড় হয় রাত।রাত মানে তো কয়েকটি প্রহর মাত্র! আর আগে মধ্যরাত খুব প্রিয় ছিলো।শব্দরা ঘিরে ধরতো মধ্যপ্রহরে।আমরা বৈঠকে মেতে উঠতাম।শব্দের সঙ্গে প্রেম ঘনিষ্ঠ হতো। ভালোবাসা জমতো।আড্ডা বসতো বেশ।এখন মধ্যরাত অবধি নিঃশ্বাসের সঙ্গে রেষারেষি।আমি জিততে না চাইলেও নিঃশ্বাস হেরে যেতে চায় না বলেই ভীষণ বেদনা হয়।বেদনা লম্বা হলে দুঃখবোধ ঘিরে ধরে। দুঃখের সাথে কিছু ছায়া।ছায়াও স্পষ্ট হয়, এখন বুঝি। ছায়া আবছায়ার অদৃশ্য যুদ্ধে ছায়ার জয় হয়।ক্লান্ত প্রহর গড়িয়ে পড়ে সুতানুলি সাপের উপর। সে চমকায়, ছোবল তোলে! কার দিকে! আমার দিকে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি; অপরাধ কি আমার? বিশ্বাসে অপরাধ হয়, তাও এখন নতুন করে বুঝেছি।সময় কতকিছুই বোঝায়।কত অজানাকে জানিয়ে দেয়!

এইসব সময়কে দুঃসময় বলতে ইচ্ছে করে না।সময়ের নিজস্ব হিসাব আছে, দায়ও আছে।সত্যকে অস্বীকার করার দায় সময় নেয় না।মানুষ সেই দায় অনেক আগেই নিয়ে নিয়েছে।

তবু মানুষকে ঘিরেই বাস, মানুষ নিয়েই আমরা তৈরি করি প্রেমোপখ্যান, কল্পিত প্রাসাদ।হরবোলা মানুষকে মানুষ হয়েও চিনতে পারি নি আজও। মধ্যরাত আমাকে সেগুলোই জানায়।শেখায়।আমার আর শেখার সময় নাই, সবিনয়ে জানিয়ে যাচ্ছি প্রায়ই।বলছি- ছুটি চাই, ছুটি চাই।ছুটি দাও, ওহে হরবোলা জীবন!

ছায়াঘেরা মধ্যরাত সদ্যজাত শিশুর মতো কাঁদে; ছুটি দেয় না কিছুতেই। আমি তিন থেকে চারটা কলম বদলাই।আঁকতে পারি না শব্দের সঠিক ছবি।আমার খুব কষ্ট হয়, বেদনা তৈরি হয়।নিঃশ্বাস আটকে আসে। আবার কলম বদলাই।আলাদা রঙের কলম খুঁজি।শব্দগুলো পোড়া কাঁঠের কান্না বুকে নিয়ে অপেক্ষা করে, বড্ড ভালোবেসে।কোনো প্রতারণা ছোঁয় না ওদের।

মধ্যরাত ও ছায়ার শব্দকে ঘিরে একটিই ছায়া থাকার কথা ছিলো। আমার নিঃশ্বাস এখনও কি তার জন্যে বেঁচে আছে? যে কিনা বিশ্বাসই করেনি এই খচিত শব্দকে।তবুও অপেক্ষা কেনো বাঁচার; কার জন্যে…
যা আমরা চোখে দেখি তার থেকে অধিক দেখা থেকে যায় অ-দেখাতে।

দৃষ্টিতে দৃষ্টিতে বুঝে নিতে হয়।না বুঝলে কিছু করার থাকে না।আমার কি মনে হয় জানিস? মানুষ যা চোখে দেখে তা হলো চোখ।আর যা মনে দেখে তা, দৃষ্টি।দৃষ্টি যদি প্রখর না হয়, অস্বচ্ছ হয় সেখানে সৃষ্টি ধরা দেয় না।প্রকৃতি সৃষ্টির মাধমে মানুষের কাছে উজার করেছে নিজেকে।আর যুগযুগ ধরে মানুষ শেুধু নিয়েই গিয়েছে, দেয়নি কিছু।এই নিঃস্ব প্রকৃতিও কেঁদেছে অনেক, কেউই বুঝিনি।

শুধরে নিতে সুযোগ দিয়েছে কতই, কেউ তা করি নি।এখনও প্রতিটি প্রহরে আমি তার কান্না শুনি।কী অসহ্য যন্ত্রণা! কাঁতর শব্দ! রাত যত বাড়ে এ শব্দ ততই স্পষ্ট হয়।বুকে বাজে বড্ড, ঘুমোতে পারি না।কত রাত ঘুমহীন কেটে যাচ্ছে, হিসেব করি না। তুই কি ঘুমোতে পারিস অতনু? হয়তো পারিস।সবার অনুভূতি তো একরকম নয়।বো্ধ যেখানে শূন্য অনুভবের সেখানে ঠাঁই কোথায় ! তোদের হিসেবের জীবন, আমার বেহিসেবের।এভাবেই তো ফুরোলো! বাকিটাও যাবে, যাক না..!