<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>কাজী লাবণ্য &#8211; যোগসূত্র</title>
	<atom:link href="https://www.jogsutra.com/tag/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%af/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://www.jogsutra.com</link>
	<description>সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির অন্তর্জাল</description>
	<lastBuildDate>Tue, 23 Apr 2024 13:46:04 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=6.9.1</generator>

<image>
	<url>https://www.jogsutra.com/wp-content/uploads/2021/01/cropped-jogsutra-32x32.png</url>
	<title>কাজী লাবণ্য &#8211; যোগসূত্র</title>
	<link>https://www.jogsutra.com</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>বই পড়া নিয়ে মজার গপ্পো ॥ কাজী লাবণ্য</title>
		<link>https://www.jogsutra.com/2024/04/23/%e0%a6%ac%e0%a6%87-%e0%a6%aa%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%8b-%e0%a5%a5/</link>
					<comments>https://www.jogsutra.com/2024/04/23/%e0%a6%ac%e0%a6%87-%e0%a6%aa%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%8b-%e0%a5%a5/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[যোগসূত্র]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 23 Apr 2024 13:46:04 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গদ্য]]></category>
		<category><![CDATA[কাজী লাবণ্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.jogsutra.com/?p=3188</guid>

					<description><![CDATA[আলো কেবল ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে যেতে পারে।আর বই! বই অতীত থেকে বর্তমান, ভবিষ্যৎ, নিকট থেকে দূর, প্রান্ত থেকে অন্তে এমনকি যুগ থেকে যুগান্তরে আলো পৌঁছে দিতে পারে।তাই দেশকালের সীমানা অতিক্রম করে &#8230; ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div style="margin-top: 0px; margin-bottom: 0px;" class="sharethis-inline-share-buttons" ></div><p style="text-align: justify">আলো কেবল ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে যেতে পারে।আর বই! বই অতীত থেকে বর্তমান, ভবিষ্যৎ, নিকট থেকে দূর, প্রান্ত থেকে অন্তে এমনকি যুগ থেকে যুগান্তরে আলো পৌঁছে দিতে পারে।তাই দেশকালের সীমানা অতিক্রম করে জ্ঞানের আলোকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে একমাত্র বই।</p>
<p style="text-align: justify">বিনোদন থেকে শিক্ষা, অবসর যাপন থেকে নিঃসঙ্গতার সঙ্গী সবতেই বই উৎকৃষ্ট অবলম্বন।আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছেন ‘বইয়ের মত এত বিশ্বস্ত বন্ধু আর নেই’।মহৎ ব্যক্তিবর্গের বই নিয়ে এমন হাজারো মূল্যবান উক্তি আছে।আমার আজকের প্রসঙ্গ তা নয়।আজকের বিষয় ‘বইপড়া নিয়ে মজার ঘটনা’।</p>
<p style="text-align: justify">আমি একজন আজন্ম পড়ুয়া মানুষ।সব সময় বলি আমি হচ্ছি ‘ঠোঙা পড়ুয়া’। সত্যি সত্যি বাড়িতে বাজার সদাই আসত যে কাগজের ঠোঙায় তা না ছিঁড়ে হাত দিয়ে সমান করে যত্নে তুলে রাখত আমাদের বাড়ির কাজের সহায়ক মেয়েটি।স্কুল থেকে ফিরে খেয়ে দেয়ে আমি সেসব নিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করতাম আর গিলতাম।</p>
<p style="text-align: justify">বাড়িতে পড়ার চমৎকার পরিবেশ এবং প্রচুর বই ছিল।আমার আব্বা, মেজো আব্বা, মা, বড়ভাই, মেজোভাই সবাই নিজ নিজ রুচি পছন্দে বিভিন্ন বই, পত্র-পত্রিকা পড়ত।আর ছোট্ট আমি তাঁদের সকলের বইগুলি, পত্রিকাগুলি উই পোকার মতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খেয়ে ফেলতাম।</p>
<p style="text-align: justify">বাড়িতে বই পড়ার উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ক্লাসের বই আগে পড়তে হবে এমন নির্দেশনা জারি ছিল।সত্যি বলতে, ক্লাসের বই তেমন টানত না।কিন্তু, উপন্যাস, গল্প, অনুবাদ, ভ্রমণকাহিনি, নাটক, সমস্ত বই আমাকে চুম্বকের মত টানত।এ যেন এক দুর্নিবার নেশা।</p>
<p style="text-align: justify">অষ্টম, নবম শ্রেণির আগেই দস্যু বনহুর, কুয়াশা সিরিজ, আশুতোষ, নিমাই, ফাল্গুনী, শরৎচন্দ্র, নীহাররঞ্জন, আরো অনেক বই শেষ করে, হাত বাড়িয়েছি সুনীল, সমরেশ, রিজিয়া রহমান, শীর্ষেন্দু, মুজতবা আলী, মীর মোশাররফ হোসেন, আশাপূর্না দেবী, মৈত্রী দেবী, গজেন্দ্রকুমার প্রমুখের প্রতি।সারারাত জেগে এক একটি বৃহৎ ভলিউমের বই শেষ করার বহু নজির আমার ফেলে আসা অতীতের গর্ভে লুকিয়ে আছে।</p>
<p style="text-align: justify">মেজো আব্বা সেবা প্রকাশনীর প্রতিটি বই নিয়মিত পড়তেন। মাসুদ রানা সিরিজ এবং অন্যান্য অনুবাদ বের হলেই কিনে আনতেন। সামনে আমার স্কুল ফাইনাল, বড়ভাই তখন আইসিএমএ আর মেজোভাই বুয়েটে পড়ে। দুজনেই ঢাকায় থাকে। মাঝেমধ্যে বাড়িতে এলে অংক দেখিয়ে দিতে বসে আর কিছু উপদেশ দিয়ে টিয়ে আবার ঢাকা চলে যায়।</p>
<p style="text-align: justify">মেজোভাই আমাকে ডেকে বলল, ‘বই পড়িস পড়, কিন্তু সেবা’র কোন বই পড়বি না’।এগুলো কলেজে উঠে তারপর পড়বি।মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাই।বাড়িতে বড়দের মান্য করার এক অদৃশ্য কড়া কানুন বহাল ছিল। আব্বারা পর্যন্ত নিজ নিজ বড়ভাইদের অসম্ভব সমীহ করতেন। তো মেজোভাই বলে গেল সেবার বই না পড়তে, আমিও বাদ দিলাম।অন্যসব বই পড়ি, সেবা বাদ বা স্থগিত।</p>
<p style="text-align: justify">স্কুল ফাইনাল শেষ।পড়ার জন্য হাতে বই নেই, থাকবে কি করে! বড়ভাই ততদিনে কাজী পাড়ার আর সব কাজিনদের নিয়ে বাড়ি থেকে দূরে ‘আলোর দেয়ালী পাঠাগার’ নামে একটি পাঠাগার গড়ে তুলেছে।বাড়ির যত বই ঝেটিয়ে নিয়ে গেছে।আমার নিরবচ্ছিন্ন ছুটি চলছে, বইয়ের অভাবে অস্থির হয়ে আছি।নতুন বই হাতে না থাকলে পুরান বই আবার পড়তে আমার বিন্দুমাত্র সমস্যা হয় না। কিন্তু নতুন পুরান কোন বই-ই তো নেই। আছে একগাদা পুরনো বিচিত্রা, রোববারসহ বিভিন্ন পত্রিকা।</p>
<p style="text-align: justify">বাধ্য হয়ে, সেসব পড়ি, একের ভেতর পাঁচ বইয়ের রচনা, আত্মকথাগুলি পুনরায় পড়ি কিন্তু মন ভরে না। বই চাই বই।এর মধ্যে মেজো আব্বা একদিন সেবা প্রকাশনীর বেশ কয়েকটা নুতন বই এনেছেন। তা দেখে, আনন্দে আমার বুকের ভেতরে ময়ুর পেখম মেলেছে।তক্কে তক্কে আছি আব্বার কখন পড়া শেষ হবে, পড়া শেষের আগে হাত দেওয়া যাবে না।</p>
<p style="text-align: justify">ছুটিতে বড় দুই ভাই বাড়ি এসেছে।বাড়িতে আনন্দ উৎসব চলছে।অবশ্য আমার মায়ের তদারকিতে বাড়িতে প্রায় সময়ই খাবারের উৎসব চলে। ভাবলাম এইতো কিছুদিন পরেই তো কলেজে উঠব।কাজেই&#8230;<br />
কাজিন রেখা। আমার সবকিছুর সাথী। ওর সাথে পরামর্শ হলো কিভাবে বই দেওয়া নেওয়া হবে।পড়ার টেবিল জানালার পাশে, ওপাশে গোলাপজামের গাছ।রেখা বই নিয়ে পেছনে, গোলাপজাম গাছের তলায় গিয়ে জানালা গলিয়ে আমাকে দেয় আমি কোন একটা বইয়ের ভেতরে ঢুকিয়ে মহানন্দে পড়ি।শেষ হলে আবার তেমনিভাবে ফেরত দেই। মেজো আব্বা বা মেজো ভাই কেউ কিছু বুঝতে পারে না।একদিন এমনিভাবে বই বিনিময় হচ্ছে একদম আকস্মিক আমার কানের পাশে কি একটা যেন ‘বুম’ করে উঠল।কানে তালা লেগে গেল, মাথা ঝিমঝিম করছে।</p>
<p style="text-align: justify">কাজীপাড়ার মসজিদ থেকে আমাদের ওস্তাদজীর সুরেলা আজান ভেসে আসছে। রাজহাঁসের ঝাঁক হেঁকেডেকে নিজ ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। গোলাপজামের গাছে থোক থোক অন্ধকার বাসা বাঁধছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি ওপাশে রেখা নেই, হাওয়া।এদিকে পেছনে তাকিয়ে দেখি রাগান্বিত মেজোভাই দাঁড়িয়ে আর জানালার শিকের ফাঁকে সেবার মাসুদরানা জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে আছে।</p>
<p style="text-align: justify">একটা কথা আছে না! ‘ফুলের টোকা’! আমার আব্বা আমাকে সারা জীবনে একটা ধমক তো দূরের কথা একটা ফুলের টোকাও দেয়নি। হ্যাঁ, মায়ের হাতে মার খেয়েছি।আর সেদিন মেজোভাইয়ের হাতে কী একটা থাপ্পড় যে খেয়েছিলাম!</p>
<p style="text-align: justify">অথচ, এদিকে মারিও পূজোর ‘গডফাদার’ ১,২,৩,৪ যখন পড়ছি, তখন আব্বাও পড়ছেন। হয়ত আমাকে বলছেন তোর পড়া হলে অমুক ভলিউমটা দিয়ে যাস তো মা।এটি ইতালীয়-মার্কিন লেখক মারিও পুজোর লেখা একটি অপরাধ উপন্যাস বা ক্রাইম ফিকশন।</p>
<p style="text-align: justify">বই পড়া নিয়ে এমন মজার কত হিরন্ময় স্মৃতি যে আছে! পড়া নিয়ে একবার মায়ের হাতেও মার খেয়েছিলাম।</p>
<p style="text-align: justify">আমার যখন বিয়ে হয়ে গেল সবচেয়ে খুশি হয়েছিলাম দুটো ব্যাপারে। এক খাওয়া নিয়ে পীড়াপীড়ি করা নেই আর দিনরাত বই পড়লেও বলার কেউ নেই। অবাধ স্বাধীনতা। কেউ বলে না-রাত অনেক হয়েছে ঘুমা।<br />
অনেক বেলা হয়েছে গোসলে যা এখন পড়ার সময় পড়তে বস এখন খাবার সময় খেতে আয়&#8230;</p>
<p style="text-align: justify">বিয়ের পরে চিটাগাং এ থাকি। ২০/২২ বছরের ঘোর লাগা তরুণী। ডানে বামে সামনে পেছনে উপরে নিচে যেদিকে তাকাই বিস্মিত হই। মুগ্ধ হই। সেখানকার প্রকৃতি অপরূপ সুন্দর। কোলে আমার দু’বছরের তা তা থৈ থৈ সন্তান।সন্তানের বাবা সরকারি বাংলো পায়নি, ভাড়া বাসায় থাকি লালখান বাজারে।সবকিছু ঠিকঠাক চললেও মন ভালো থাকে না। বইয়ের ভাণ্ডার নেই।একটা দুটো বই দিয়ে আমার ক্ষুধা মেটে না।খুঁজতে খুঁজতে বাসার কাছেই একটি বুকস্টল পেয়ে গেলাম, আমাকে আর পায় কে! বই কিনে আনলাম।পড়লাম, শেষ হয়ে গেল। আরো চাই, আরো, কিন্তু এত দাম! ক’টা কিনব! স্টলে যাই বই নাড়াচাড়া করি অনেক, কিন্তু কেনার সময় মাত্র একটি কিনি তাও আবার শীর্ণকায়। আমার চাই অভিধানের মত ভলিউম। আর দোকানের প্রতিটি তাকে চকচকে মলাটের, মোটা মোটা কত যে বই! আমার মোহাবিষ্ট চোখ প্রতিটি বইয়ের প্রচ্ছদে ঘোরে ফেরে।</p>
<p style="text-align: justify">দোকানের ছেলেটির সম্ভবত মায়া হয়।নির্মল মায়া। সমবয়সী ছেলেটি একদিন আমায় বলে,‘আপনি বুঝি খুব বই পড়েন? কিছু না বলে হাতের বইটির পাতা উল্টাই আর স্মিত হাসি’।‘শোনেন, আমিও খুব বই পড়তাম। পড়ার নেশা থেকে বহু কষ্টে নিজের স্বপ্নপূরণ করেছি, এই স্টল দাঁড় করিয়েছি।এখন পড়িও বিক্রিও করি।এটা আমার জন্য খুব আনন্দের, আপনি এক কাজ করেন আপনি একটি দুটি করে বই নিয়ে যান, কিন্তু অনুরোধ বইয়ে কোন দাগ বা ভাঁজ ফেলবেন না।পড়া শেষে দিয়ে যাবেন’।</p>
<p style="text-align: justify">কেউ কি আন্দাজ করতে পারবে, তখন আমার মনের অবস্থা!<br />
আনন্দ, খুশি, এবং অজানা এক অনুভূতিতে ভেতরে ভেতরে কেঁদে ফেলেছিলাম। এরপর সেই স্টল থেকে অসীম সংখ্যক নানাবিধ বই বাসায় এনে আগে খবরের কাগজ দিয়ে মলাট করে, সাবধানে যত্ন সহকারে পড়ে ফেরত দিয়ে আসতাম।এভাবে বছরের পর বছর চলেছে। কী এক অপার্থিব আবেশে দিনরাত কেটে যেত! কোন রকম অমলিনতা, ঝুটঝামেলা আমাকে স্পর্শ করত না। যেন আকাশভরা নক্ষত্রেরা আমায় ঘিরে থাকত। আহা! কত কত বই&#8230;</p>
<p style="text-align: justify">তারপর বদলি হয়ে আমরা ঢাকায় চলে আসি।দুঃখের বিষয় উদার মনের সেই ছেলেটির সাথে কোন যোগাযোগ আর হয়নি।তাকে একটা মামুলি ধন্যবাদও দেইনি, জানি বড় মাপের মানুষেরা ধন্যবাদের তোয়াক্কা করে না।আজ মনে হয় যোগাযোগ রাখা উচিত ছিল।আর আজ এও মনে হয় ছেলেটি দারুণ সুদর্শন ছিল।</p>
<p style="text-align: justify">সে সময় কিন্তু ঘুণাক্ষরেও তা মাথায় আসেনি। কারণ নেশাগ্রস্ত মানুষরা কোনদিকে তাকাবার অবস্থায় থাকে না।নেপোলিয়ানের মত আমিও মনে করি ‘অন্তত ষাট হাজার বই সঙ্গে না থাকলে জীবন অচল’।সত্যি অচল।</p>
<p style="text-align: justify">সবাইকে আজকের দিবসের শুভেচ্ছা।</p>
<div style="margin-top: 0px; margin-bottom: 0px;" class="sharethis-inline-share-buttons" ></div>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://www.jogsutra.com/2024/04/23/%e0%a6%ac%e0%a6%87-%e0%a6%aa%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%8b-%e0%a5%a5/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ধুপশিখা ॥ কাজী লাবণ্য</title>
		<link>https://www.jogsutra.com/2023/10/29/%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%aa%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a5%a5-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%af/</link>
					<comments>https://www.jogsutra.com/2023/10/29/%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%aa%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a5%a5-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%af/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[যোগসূত্র]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 29 Oct 2023 13:08:47 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[কাজী লাবণ্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.jogsutra.com/?p=2935</guid>

					<description><![CDATA[কাশফুলের মতো শ্বেতশুভ্র ধোঁয়ার শিখাগুলি কিছু সোজা আবার কিছু কিছু একসাথে কুণ্ডলি পাকিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে আর মন কেমন করা এক অদ্ভুত গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।চাল ভর্তি একটি ম্যালামাইনের বাটিতে &#8230; ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div style="margin-top: 0px; margin-bottom: 0px;" class="sharethis-inline-share-buttons" ></div><p style="text-align: justify">কাশফুলের মতো শ্বেতশুভ্র ধোঁয়ার শিখাগুলি কিছু সোজা আবার কিছু কিছু একসাথে কুণ্ডলি পাকিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে আর মন কেমন করা এক অদ্ভুত গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।চাল ভর্তি একটি ম্যালামাইনের বাটিতে কদমফুলের মতো আগরবাতি গুলি গেঁথে দিয়ে চৌকির তলায় রাখা হয়েছে।আরও বেশ কয়েকটি এমন বাটি, কয়েকটি আগরদানি বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় আছে।উঠোনের এক কোনায় সেই ভেজা জায়গাটাতেও একগুচ্ছ আগরবাতি মাটিতে গাথা হয়ে গন্ধ বিলিয়ে যাচ্ছে।</p>
<p style="text-align: justify">এই আগরবাতির গন্ধটি যেন কেমন! এই গন্ধ নাকে এলেই মিলাদ, ঈদ, কোরান খতম, বা এই ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা মৃত্যুবাড়ির কথাই মনে হয়।সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে অনেক কিছু, সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছুই চলে গেছে চির বিলুপ্তির পথে।বহু আগে মানুষ সুগন্ধি হিসেবে আতর ব্যাবহার করলেও এখন বেছে নিয়েছে আধুনিক বডি স্প্রে বা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পারফিউম।পরিবেশের জন্য এসেছে বিভিন্ন দামের বিভিন্ন নামের এয়ার ফ্রেশনার, কিন্তু পরিস্থিতি মতো আগরবাতির জায়গা আছে এক অভিন্ন।</p>
<p style="text-align: justify">এখন রাত কটা বাজে কে জানে! সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ, চারিদিকে সুনসান নিরবতা, আগত শেষ মানুষটিও চলে যাবার পর পুরো পরিবেশ যেন আচমকা পালটে গেল।আচানক আমার মনে একটি অদ্ভুত ভাবনা এলো, ‘আচ্ছা এখন এই নিরিবিলিতে যখন দেখার বা শোনার কেউ নাই, এই ফাঁকে আব্বা কি একবার আমাকে কিছু বলতে পারে না!একটিবার। একটু খানি কথা!এই রহস্যময় মহাবিশ্বে কতো কিছুই তো ঘটে! কত অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়! যদি তাই হত আমি কাউকে বলতাম না।সত্যি সত্যি সেই অসম্ভব অলৌকিক কিছু ঘটার আশায় বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে একটু পা চালিয়েই আব্বার কাছে গেলাম তার পাশ ঘেষে তার চৌকিতে বসলাম, আব্বা কি কিছু বলবে আমাকে।</p>
<p style="text-align: justify">এই নির্জন নিস্তব্ধ চরাচরে যখন কেউ কোথাও জেগে নেই, আব্বা কি পারে না তার আলাভোলা প্রিয় কনিষ্ঠ সন্তানকে কিছু বলতে! চিরদিনের জন্য স্পর্শের একটু শেষ ভরসা দিতে!</p>
<p style="text-align: justify">আমি শহরের একটি বেসরকারি কলেজের অংকের মাস্টার।অংক একটি রহস্যময় আবার লজিক্যাল ব্যাপার হলেও আমি মানুষটা লজিকের বাইরে চিন্তা ভাবনা করি।যদিও সেগুলি খুব কার্যকর কোন চিন্তা-ভাবনা নয়।কিন্তু না ভেবে পারি না।আমরা ৪ ভাই আর ১ বোন।৩ ভাই নিজেদের ব্যবসা, জমি জমা, গঞ্জের দোকান, কিছু বাসা ভাড়া দেওয়া আছে সেগুলির দেখাশোনা করে।আব্বা মা, ৩ ভাই ও তাদের বৌ-বাচ্চা মিলে এখনও আমাদের যৌথ পরিবার।কেবল আমি চাকরির কারণে পরিবার নিয়ে শহরে থাকি।এই উপজেলা থেকে শহরের দূরত্ব বেশি নয়।</p>
<p style="text-align: justify">আব্বা ছিলেন অত্র এলাকার একজন মান্যগণ্য রাজনৈতিক ব্যক্তি। আজকালকার নৈতিক অবক্ষয়ের ঘৃণ্য রাজনীতি নয়, যখন রাজনীতি সত্যিই মানুষের কল্যাণে কাজ করত সেই তখনকার রাজনীতি।ব্যক্তি হিসেবেও তিনি ছিলেন একজন ত্যাগী, পরিশ্রমী, মিতব্যয়ী, নির্মল চরিত্রের সমুজ্জ্বল প্রতীক।তিনি সারাজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। আর মা! তিনিও বাবার ছায়া হয়ে নিজের মতো সংসার, সন্তান এবং আব্বার আদর্শকে মেনে নিয়ে জীবন নির্বাহ করেছেন। মা ছিলেন নিঃস্বার্থ দেশ সেবার মন্ত্রে দীক্ষিত আব্বার যথার্থ জীবন সঙ্গিনী। মা আত্মপ্রত্যয়ে ভরা ত্যাগী সাহসী একজন মানুষ, মা বিশ্বাস করেন কেবল ধন থাকলেই ধনী হয় না, যার যতটুকু আছে তা থেকে যে অকাতরে দান করতে পারে, সেই প্রকৃত ধনী। আব্বা- মা দুজনেই তাদের বিশ্বাস সন্তানদের মাঝে গ্রোথিত করার চেষ্টা করেছেন।</p>
<p style="text-align: justify">সত্তুর আশি বছরের পুরনো আব্বা মা আমাদেরকে নিজেদের আত্মিক ও জাগতিক গুণাবলীর সমন্বয়ে প্রকৃত মানুষ করার চেষ্টা করেছেন।কতটা আমরা হতে পেরেছি, জানি না।তবে আমি আমার মননে চেতনে ধারণ করি যে এমন সবল শুদ্ধ চরিত্রের অনন্য সাধারণ বাবা মায়ের সন্তান হতে পারাটাও জীবনের এক অতুলনীয় প্রাপ্তি।তারপরও জেনারেশন গ্যাপ সম্ভবত থেকেই যায়।</p>
<p style="text-align: justify">খুব স্বাভাবিক নিয়মে বয়স হলেও রোগ ব্যধি বিষণ্নতা বা জীবনের উপর কোনো বিরূপ মনোভাবে আব্বা কখনই জরাগ্রস্ত বা ভারাক্রান্ত হননি।আব্বার সঙ্গী ছিল একটি ইয়ামাহা-১৪০ মোটর বাইক, সকল কাজে এটাই ছিল তার একমাত্র বাহন।যখন তিনি এমপি ছিলেন তখনও তিনি (রাজধানীতে যখন গেছেন সেই সময় ছাড়া) অক্লান্ত এই বাহনই ব্যবহার করেছেন।অকুতোভয় মানুষটি অন্যায়ের সাথে, ভোগ বিলাসিতার সাথে আপস করেননি।</p>
<p style="text-align: justify">জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের কাজ নিজের হাতে করে সকলের কাছে বিদায় নিয়ে, সন্তানদেরকে শেষ উপদেশ দিয়ে, মার কাছে বিদায় নিয়ে চিরদিনের জন্য চোখ বুজেছেন।গত দুদিন ধরেই আব্বার শরীর খারাপ ছিল, শোনামাত্রই আমি সপরিবারে ঐদিনই চলে আসি।গত দুদিন ধরে আমি আব্বার বিছানার এক কোনে চুপচাপ বসে থাকতাম, তার অসুস্থতার খবর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লে, স্রোতের মতো লোকজন আসতে থাকে।আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব ছাড়াও আসতে থাকে আব্বার কাছ থেকে যারা উপকৃত হয়েছে, যারা আব্বাকে বিপদের বন্ধু বলে জানে তারা।গত দুদিন ধরে চলে দর্শনার্থী মানুষের ঢল।আমি আব্বার কোন কাজে আসি না, কেবল চুপচাপ এক কোণে বসে বসে আব্বার দিকে তাকিয়ে থাকি।তিনি প্রায় সকল মানুষের মাথায় হাত বুলিয়ে মঙ্গল প্রার্থনা করেন এবং নিজের জন্য দোয়া করতে বলেন।এভাবে একের পর এক চলতেই থাকে।ডাক্তারের এর নির্দেশ অনুযায়ী বড় ভাইয়েরা এই মানুষের ঢল অনুমোদন করছিলেন না, কিন্তু আব্বার প্রবল ইচ্ছায় আবার কিছু বলতেও পারছিলেন না।ডা. এবং ভাইদের হাজার অনুরোধ স্বত্বেও আব্বা কিছুতেই হসপিটালে যেতে রাজি হলেন না।তিনি ধীর স্থির ভাবে এক কথাতেই অনড় রইলেন, বললেন,<br />
‘আমার সময় শেষ, কোন বিষয়েই তোমরা আমায় জোর করবে না’&#8230;</p>
<p style="text-align: justify">একইরকম ভাবে গত দুদিন যাবার পর আজ শেষ বিকেলে আব্বা বললেন তাঁর চার পুত্র আর আম্মা বাদে কেউ যেন ঘরে না থাকে।তাঁর ইচ্ছেমতো ব্যবস্থা করা হলে, আব্বা প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন।কবছর আগে প্রয়াত একমাত্র কন্যার জন্য নিরব থাকলেন, তারপর আম্মার ব্যাপারে বললেন কোনো অবস্থাতেই আম্মার যেন কোনো অসুবিধা বা অযত্ন না হয়।তারপর বললেন-‘তোমরা আমার জন্য দোয়া কর, কিন্তু কান্নাকাটি বা আমার জন্য বিশাল বড় কাঙালি ভোজের আয়োজন করবা না’।</p>
<p style="text-align: justify">বলার সামান্য পরেই সত্যি সত্যিই আমাদের জোড়া জোড়া সজল চোখের সামনে আব্বা চলে গেলেন অতি নিরবে নিশ্চুপে বিনা ভয়ে বিনা কষ্টে&#8230; কী প্রশান্তিময় সেই প্রস্থান!</p>
<p style="text-align: justify">আশ্চর্য, খুব আশ্চর্য! মৃত্যু এমন! বিস্ময়কর মৃত্যু আমায় একেবারে নির্বাক করে দিল।ভাইয়েরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে, মায়ের গলা ধরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।মা ভীষণভাবে ভেঙে পড়লেন আর চিরকালই শান্ত ও ছাড়া ছাড়া স্বভাবের আমি বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে রইলাম। আমার গুছানো অতি পরিচিত ভুবন যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়ল, আমার হতবিহবলতা কাটে না, একদম বিশ্বাস হয় না আব্বা চলে গেলেন! আব্বা আর নেই! এখন তাকে বলা হবে ডেডবডি বা লাশ। এ কি করে সম্ভব! এই যে আব্বা আমাদের মাঝেই শুয়ে আছেন, তাঁর অবিকৃত শরীর এখনও গরম অথচ তিনি নেই।</p>
<p style="text-align: justify">একজন মানব শিশু জন্মাবার পর তাকে মানুষ করতে চলে যায় বছরের পর বছর, মানব শিশুর মত এতো সময় নিয়ে আর কোন প্রাণীই তো বড় হয় না। সেই পরিপূর্ণ একজন মানুষ কিনা এক লহমায় শেষ! সে আর মানুষ রইল না! হয়ে গেল কেবল দ্রুত পচনশীল এক শরীর! তখন সকলের মুখে এক কথা তাড়াতাড়ি ঢাকার ব্যবস্থা কর, ঢাকার ব্যবস্থা কর। একজন কেউ মুরব্বি এসে আব্বাকে আপাদমস্তক একটা চাঁদরে ঢেকে দিলেন।মুহূর্তেই চারিদিক থেকে আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, রাজনৈতিক সহযোগী, ভক্ত, সমর্থক দিয়ে বাড়ি ভরে উঠতে লাগল..</p>
<p style="text-align: justify">একসময় ভাইয়েরা ও ময়মুরব্বি মিলে ঠিক হলো আগামীকাল সকাল সকাল আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে জানাজা শেষে তাঁকে কবর দেওয়া হবে।</p>
<p style="text-align: justify">একজন কেউ মারা গেলে মৃত্যু পরবর্তী বহু করণীয় দায়িত্ব কর্তব্য থাকে।আমার তিনজন বড় ভাই, মামাত চাচাত ভাই আরও প্রচুর আত্মীয় স্বজন মিলে সেগুলি করতে লাগল।যেমন কাফনের কাপড়, নতুন সাবান, লোবান, আগরবাতি ইত্যাদি কিনে আনা।মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করা, বাঁশ কাটা, কবর খোঁড়া, হুজুরদের খবর দেওয়া, নাম ধরে ধরে প্রতিটি মানুষকে ফোন করে শোক সংবাদ দেওয়া ইত্যাদি, কোন কাজই বাকি রইল না।</p>
<p style="text-align: justify">আব্বার গোসল দেওয়া হল।তাকে উঠানের এক কোনে একটি চৌকিতে শুইয়ে রাখা হল চাদরে ঢেকে।গোসলের জায়গাটি পানি ঢেলে লে‌পে দেওয়া হল। সেখানে ধুপ এবং আগরবাতি জ্বালানো হল।তাহলে মৃত্যু কি অশুচি ব্যাপার! যে জায়গায় কেউ মারা যায় সে জায়গাও কি অশুচি হয়ে যায়!</p>
<p style="text-align: justify">রাত বাড়তে লাগলে ধীরে ধীরে আগত মানুষজন চলে গেলে চারপাশ সুনসান হয়ে আসে।কেবল এতিমখানা থেকে আগত কয়েকজন ছোট ছোট ছেলে ঢুলে ঢুলে পবিত্র গ্রন্থ পাঠ করতে থাকে।একটু পরে তাদেরও গলার মিঠে সুর স্তিমিত হয়ে আসে।</p>
<p style="text-align: justify">অত্র এলাকার রীতি অনুযায়ী কেউ মারা গেলে আত্মীয় প্রতিবেশীরা খাবার দিয়ে যায়।যে কদিন কুলখানি না হয় খাবার আসা চলতেই থাকে।অনেক সময় আত্মীয় প্রতিবেশী বসে আলোচনা করে ঠিক করে নেয় কে কোন বেলা খাবার দেবে তারপরও দেখা যায় কোনো বেলা একাধিক বাড়ি থেকে খাবার চলে আসে।বাড়ির মানুষ, আগত আত্মীয় স্বজন খেয়েও অনেক খাবার বেঁচে যায়, সেগুলো গরীব মানুষদেরকে খাওয়ানো হয়।আজ রাতেও কে যেন প্রচুর খাবার এনে বাড়ির সকলকে সামনে বসিয়ে মমতার সঙ্গে খাইয়ে দিয়েছে।উপস্থিত সকলেই খেয়েছে, যারা আব্বাকে গোসল দিয়েছে তারা, বড় হুজুর এবং তার সাথে আসা সব তালেব উল এলেমরা সকলেই খেয়ে দেয়ে যার যার ঠিকানায় চলে গেছে।</p>
<p style="text-align: justify">আমাকেও কে যেন ডেকে খাবার টেবিলে বসিয়ে দিয়েছিল খেয়ে নিয়েছি, মনে হয় বেশীই খেয়ে ফেলেছি, কেন যেন খুব ক্ষুধা লেগেছিল।</p>
<p style="text-align: justify">আগামীকালের কাজকর্মের আলোচনা সেরে সকলেই চলে গেলে, খালা চাচির সহায়তায় হাইপ্রেসার ও ডায়াবেটিসের পেসেন্ট শোকে মূহ্যমান দিশেহারা আমার মা শুয়ে পড়লেন।সবাই চলে যাবার পর কেবল আমার তিন বড়ভাই আলোচনা করে ঠিক করলেন- কোন এমপি, মন্ত্রীকে কুলখানিতে ডাকবেন।এও ঠিক হলো কুলখানির আয়োজন হবে দু ধরনের সাধারণ মানুষের জন্য একরকম আর ভিআইপিদের জন্য স্পেশাল।একজন ভাই বলে উঠলেন আচ্ছা সেসব আলোচনার জন্য আরো সময় আছে, এখন ঘুমানো যাক।তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলেন-সাদা পাজামা, পাঞ্জাবি টুপি সব ঠিকঠাক আছে না নেই কে জানে! এরই মধ্যে কেউ একজন বড়, মেজো কিংবা সেজো উঁচু গলায় আমাকেও ডাক দিলেন।</p>
<p style="text-align: justify">নির্জন রজনী ধীরে ধীরে কেমন যেন ভুতুড়ে হয়ে উঠতে লাগলো। বাড়ির চারপাশে লাগানো বাল্বগুলোকে ঘিরে নানা পতঙ্গ উড়তে লাগলো।</p>
<p style="text-align: justify">পবিত্র কোরান তেলাওয়াতকারীরা ঝিমিয়ে পড়ে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়েছে। খাবারের লোভে যে কুকুরগুলি এসেছিল তারাও এক সময় এ কোনায় সে কোনায় ঘুমিয়ে পড়েছে, কেবল ঘুমহীন আমি জেগে রান্না ঘরের পাশে ঝোপালো কামরাঙা গাছটির নিচে একটি টুলে বসে আছি। মানুষের অহেতুক কৌতূহলী প্রশ্নের হাত থেকে লুকিয়ে থাকার জন্য এই গাছের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোনো জায়গা হয় না।ছোটবেলা থেকে বাড়ির অবস্থা বুঝে কত আমি এখানে উঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম, মা জানতেন কিছু বলতেন না।পরিস্থিতি আমার অনুকূলে এলে নেমে আসতাম।মা এসে জড়িয়ে ধরে গায়ে মাথায় আটকে থাকা নাকফুলের মত কামরাঙার অপুর্ব ফুল, হলুদ পাতা, মাকড়শার ঝুল মুছে দিয়ে আদরের ঠোঁট কপালে ছুঁইয়ে বলতেন ‘যা বাবা খেলতে যা কিংবা পড়তে যা’। আমি চলে গেলে নিশ্চয়ই মার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসত। আজও কয়েকবার আমার সেই পুরনো অভ্যাস মনে মনে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।কিন্তু এখন অদম্য ইচ্ছেকে দমন করতে শিখে গেছি।</p>
<p style="text-align: justify">আমি আগা গোড়াই একটু তফাতে দাঁড়িয়ে বা বসে বসে সব অবলোকন করে যাচ্ছিলাম। না ইচ্ছে করে বিশেষ কিছু দেখার জন্য নয়, আমার বৈশিষ্ট বা স্বভাবটাই এমন।অনেক কিছুতেই আমার খটকা লাগলেও আমি কাউকে কিছু বলতে পারি না, আবার করতেও পারি না।একদম ছোটবেলা থেকেই আমি এরকম।অনেক বড় হবার পর আমি বুঝতে পেরেছি ব্যাপারটা কিন্তু তার অনেক আগেই আব্বা বুঝতে পেরেছিলেন এবং আমাকেতো নয়ই কাউকে না জানিয়ে আব্বা ডা. এর পরামর্শ মতো নিজের বুদ্ধি বিবেচনা মত আমার সাথে প্রতিটি আচরণ করেছেন, আগলে রেখেছেন, কেউ যেন আমায় অন্যরকম কিছু মনে না করে সেজন্যে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রেখেছেন।তিনি চাননি পরিবার, সমাজ বা পৃথিবী আমাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করুক বা আলাদাভাবে ট্রিট করুক।সে সময় এই ব্যাপারে কোনোরকম জন সচেতনতা বা সুচিকিৎসা গড়ে উঠেনি, তারপরও আব্বা খুজে খুঁজে ঢাকা শহরের কোন এক ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছেন এবং অনেক খুঁজে এর ওপর একটি বই কিনেছেন যদিও সেটি ইংলিশে লেখা ছিল।অংকে ভালো ছিলাম বলে কোনরকমে মাস্টার্স কমপ্লিট করতে পেরেছি, আসলে আমি কি করেছি! আব্বাই হাতে ধরে করিয়েছিলেন। আবার নিজের এক বিধবা বোনের মায়াবতী একটি মেয়ের সাথে বিয়েশাদি দিয়ে আমার জীবনটাকে স্বাভাবিক একটা গতি এনে দিয়েছেন। অনেক বড় হবার পর আব্বার সংগ্রহের প্রচুর বইয়ের মাঝে সেই বইটি পেয়েছিলাম সেটি পড়তে গিয়েই আমি বুঝে যাই আমার ব্যাপারটা। অবশ্য আমি নিশ্চিত জানি না আমার সমস্যা সেটাই ছিল কিনা। হতে পারে আমার সমস্যা অন্যরকম।সেখানে অনেক লেখায় লাল কালিতে আন্ডারলাইন করা ছিল, পাশে আব্বার নিজের হাতের কিছু নোটও ছিল।বইটিতে লেখা ছিল-</p>
<p style="text-align: justify">‘অটিজম কোন সাধারণ রোগ নয়।এটি শিশুদের একটি মনোবিকাশগত জটিলতা যার ফলে সাধারণ ৩টি সমস্যা দেখা দেয়।যেগুলি হচ্ছে-<br />
প্রথমতঃ মৌখিক কিংবা অন্য কোন প্রকার যোগাযোগ সমস্যা।<br />
দ্বিতীয়তঃ সামাজিক বিকাশগত সমস্যা।<br />
তৃতীয়তঃ খুব সীমাবদ্ধ ও গণ্ডিবদ্ধ জীবনযাপন ও চিন্তাভাবনা এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ। এছাড়া অতি চাঞ্চল্য, জেদি, বা আক্রমণাত্মক আচরণ, অহেতুক ভয়ভীতি, খিঁচুনি ইত্যাদি থাকতে পারে।</p>
<p style="text-align: justify">অটিস্টিক শিশুরা সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করতে এবং সঠিক আচরণ করতে ব্যর্থ হয়। তাকে নির্দিষ্ট সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত আচরণের শিক্ষা দিতে হয় নিয়মিত’।</p>
<p style="text-align: justify">টুলে বসে বসেই আমি দেখলাম- আব্বাকে গোসল দেবার পর পর্দাঘেরা জায়গা থেকে কেউ একজন উচ্চস্বরে বলে উঠল- ‘গা মোছার তোয়ালে বা গামছা কই’?<br />
এ ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগল, আব্বার চার পুত্রবধূ বারান্দায় জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে রইল-<br />
বাড়ির পুরনো আম্মার সহকারী মেয়েটি এক দৌড়ে আব্বার ঘরের দরজায় তারে ঝুলানো বহুল ব্যবহিত প্রায় ক্ষয়ে আসা গামছাখানি এনে গোসলকারির হাতে দিল, ধরা গলায় বলল-<br />
‘এইটা নানার গামছা’।<br />
আমার বিস্ময় কাটেনা, এ বাড়ির ড্রয়ার, আলমিরা, সুটকেস, খুললে কত শত নতুন তোয়ালে গামছা রয়েছে, কেউ একটা নতুন তোয়ালে এনে দিল না!</p>
<p style="text-align: justify">গোসল শেষে আবার হাক ডাক লাশ ঢেকে রাখতে হবে পরিষ্কার কাপড় কই!<br />
কারো কোন সাড়া শব্দ নেই!<br />
একটু পর মা নিজেই ঘর থেকে বহু পুরনো একটি কাশ্মিরী শাল এনে দিল, বলল-<br />
‘এটি পরিষ্কার’।</p>
<p style="text-align: justify">আমি জানি ওটি ধোয়া পরিষ্কার।আব্বা প্রতি শীতে এই চাদর গায়ে দিতেন এবং শীত শেষে মা সেটি ধুয়ে ইস্ত্রি করে ন্যাপথলিন দিয়ে তুলে রাখতেন। সেটি বড় ট্রাংকের ভেতর শুয়ে শুয়ে পরের শীতের জন্য অপেক্ষা করত। আমার যতদুর মনে পরে আমার বোধ হবার পর থেকেই আব্বার গায়ে এই চাদর দেখে এসেছি যা এখন আর নিজস্ব বর্ণে নেই।<br />
মনে হল, বাড়িতে কত নতুন চাদর, বেডকভার আরো কত কিছু আছে কেউ একজন ছুটে গিয়ে নিয়ে এসে বলল না এটা দিয়ে আব্বাকে ঢেকে রাখ।<br />
এই তবে জীবন!</p>
<p style="text-align: justify">আব্বা এত কিছু করলেন সারা জীবন, এত সংগ্রাম করলেন দুনিয়ার মানুষের জন্য, পরিবারের জন্য, এত কৃচ্ছসাধন, এত লড়াই! অ্যাবনরমাল এক সন্তানকে কিভাবে জগত সংসারে স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠা দিলেন! এতকিছু তবে কার জন্য! যা রেখে গেলেন তাই বা কার জন্য! হায় নশ্বর জীবন!</p>
<blockquote>
<p style="text-align: justify"><span style="color: #ff0000">আমি জানি না।আমি আসলেই কিছু জানি না।বিবমিষায় আমার অন্তর যেন নিমতিতা হয়ে গেল।আমার মাথা এলোমেলো হয়ে গেল!</span></p>
</blockquote>
<p style="text-align: justify">আচ্ছা রাত এখন কত? আমার হাতে ঘড়ি নেই।বাড়ির সব দরজাই বন্ধ, কেবল মায়ের দরজা একটু ফাঁক, সিডেটিভ ঘুমের ঘোরেই মা মৃদু গোঙানোর শব্দ করছেন, এছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই।</p>
<p style="text-align: justify">সাদা কাফনে মুড়ে একটা খালি চৌকিতে আব্বা শুয়ে আছেন।সেই বিবর্ণ চাদরে আপাদমস্তক ঢাকা। হুজুর এবং বড় ভাইয়েরা মিলে অতি দ্রুত বাঁশ পুঁতে উপরে ছাউনি দিয়ে একটি সাময়িক চালা তৈরি করেছে এর নিচেই আব্বাকে রাখা হয়েছে।প্রায় আশি বছর এই গ্রহের পথপ্রান্তরে হেঁটে হেঁটে আমার ক্লান্ত আব্বা অবশেষে কাল চলে যাবেন অজানা এক ঠিকানায়।</p>
<p style="text-align: justify">আমি কি ক্লান্ত! আমি কি শোকাহত! আমি কি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করছি! না সেসব কিচ্ছু নয়।কেবল এক সীমাহীন হাহাকার আমায় গিলতে লাগল, আমার জলহীন, নিদ্রাহীন চোখ কেমন যেন জ্বালা করতে লাগল&#8230;</p>
<p style="text-align: justify">রাতের চরিত্র দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভোর হতে আর বাকি নেই, সকাল হলেই সবাই মিলে আব্বাকে নিয়ে যাবে কবরে। উঠে আস্তে আস্তে পুরো বাড়িটা হাঁটলাম, এল শেপের বারান্দা ঘুরে সব ঘরের দরজায় একটু করে থামলাম।পৃথিবী গহীন ঘুমে নিমগ্ন।পুরো বাড়ি পরিক্রমা শেষে আমি আব্বার পাশে এসে দাঁড়ালাম।একবার চৌকির নিচে উঁকি দিলাম। ভেতরের অনুভুতি ব্যক্ত করার মত বিচক্ষনতা আমার নেই, আর দশজন মানুষের মত বুদ্ধিমান বা চৌকশ আমি নই, আমার ভেতরে কোথায় যেন দুমড়ে মুচড়ে আমাকে লণ্ডভণ্ড করতে লাগল, আমার সমস্ত পৃথিবী চারপাশ থেকে ছোট হয়ে আসতে লাগল, আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল, মাথার ভেতরে এক কালো ঘুর্ণি পাগলের মতো ঘুরতে লাগল।বাড়িটা চারপাশ থেকে ছোট হয়ে আসছে।কোথায় গিয়ে আমি আমার অন্তরাত্মায় উপচে উঠা সব দুর্বিসহ যন্ত্রণা বের করে দিতে পারি! আর পারলাম না-<br />
‘আস্তে করে চৌকিতে উঠে আব্বার পাশে সেই বিবর্ণ চাদরের অর্ধেক মুড়ি দিয়ে সটান শুয়ে পড়লাম’।</p>
<p style="text-align: justify">আগরবাতির সুগন্ধি ধোঁয়া ফুরফুর উড়তে লাগল আর মরা মাছের চোখের মতো আকাশের চাঁদটা নির্বিকার তাকিয়ে রইল।</p>
<div style="margin-top: 0px; margin-bottom: 0px;" class="sharethis-inline-share-buttons" ></div>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://www.jogsutra.com/2023/10/29/%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%aa%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a5%a5-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%af/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>সংসার ॥ কাজী লাবণ্য</title>
		<link>https://www.jogsutra.com/2021/05/13/%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a5%a5-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%af/</link>
					<comments>https://www.jogsutra.com/2021/05/13/%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a5%a5-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%af/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[যোগসূত্র]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 12 May 2021 18:25:31 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[কাজী লাবণ্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://www.jogsutra.com/?p=581</guid>

					<description><![CDATA[-আম্মা! পানি গরম হইছে। সবকিছু রেডি করছি, বাবুর গোসলটা দিয়া দিবেন? সকাল সকাল উঠানে বড় গামলাতে পানি রোদে দেওয়া হয়। সুমনা মাঝে মাঝে আঙুল দিয়ে উষ্ণতা পরখ করে দেখে। বারোটা &#8230; ]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div style="margin-top: 0px; margin-bottom: 0px;" class="sharethis-inline-share-buttons" ></div><p style="text-align: justify">-আম্মা! পানি গরম হইছে। সবকিছু রেডি করছি, বাবুর গোসলটা দিয়া দিবেন? সকাল সকাল উঠানে বড় গামলাতে পানি রোদে দেওয়া হয়। সুমনা মাঝে মাঝে আঙুল দিয়ে উষ্ণতা পরখ করে দেখে। বারোটা বেজে গেছে। দিনের গায়ে চনমনে রোদের ছটা। যার আলোয় চিলতে উঠোন ঝলমল করছে। পানিও গরম হয়ে গেছে।<br />
-আচ্ছা, ঠিকাছে আসছি। সুমনার শাশুড়ি জবাব দেয়। জবাবে কি কিছুটা নির্লিপ্তভাব ছিল কি না সুমনা চেষ্টা করেও বুঝতে পারে না। শাশুড়ি এসে বাবুকে কোলে নিয়ে, আদরের চুমু দিয়ে পেতে রাখা মোড়ায় বসে। নাতিকে নিজ হাঁটুর উপরে দক্ষ হাতে উপুড় করে নেয়। সাবান মাখা নরম কাপড়ে বাবুর তুলতুলে ছোট্ট শরীরটা আলতো ডলতে ডলতে বলে-<br />
-শোন মা, ছয়মাস পার হয়া গেল। তুমি আইজও বাবুর গোসল শিখলা না! এই দেখ ভালো করি দেখি শিখি নেও। আমি নানান তাল বেতালে থাকি, সময় পাই না। তাছাড়া আমার এই কোমরের বিষ বেদনাটাও খুব বাড়ছে বাহে!</p>
<p style="text-align: justify">সুমনা কেবল শুনে যায়। উত্তর দেয়না। শাশুড়ির নানানতাল বেতাল যে কি নিয়ে তা কি আর সুমনা জানেনা! নাকি বোঝে না! বাবুর সুগন্ধি সাবানের মিষ্টি ঘ্রাণটাও আর ওর ভালো লাগে না।<br />
গোসল শেষে বাবুকে নিয়ে সুমনা নিজেদের ঘরে আসে। বাবু দুধ পান করবে, করতে করতে ঘুমিয়ে পড়বে। ঘরে ঢুকল সুমনার স্বামী শাকিল। বাড়ির মেজো ছেলে। একটু আগে সে ঘুম থেকে উঠেছে। নাস্তা খেয়ে বাইরে গিয়েছিল, সুমনা জানে ধোঁয়া টানতে গিয়েছিল।<br />
-তুমি বাবুর বিছানায় বসবা না। তোমার মুখে গন্ধ আছে। শাকিল কোন কথা না বলে, একটু এপাশ ওপাশ করে আবার বেরিয়ে যায়।</p>
<p style="text-align: justify">সুমনার শাশুড়ি মানে রাহেলা বেগম রানু ভেজা শাড়ীর পানিটুকু নিংড়ে, ঝেড়ে ঝুড়ে, বাবা জর্দাসহ মস্ত একটা পানের খিলি মুখে পুরে ঢুকে পড়ে রান্না ঘরে। আজ শোলমাছ দিয়ে শিদল রান্না হবে। বাড়ির সবাই এ তরকারির ভক্ত। ভক্ত মানে মহাভক্ত। সাথে শুকনা মরিচ পুড়ে লাল লাল করে আলুভর্তা আর ঘন মাষকলাইয়ের ডাল। ছোট মেয়ে রিমি আছে বড়বাবুর কাছে, ও বসে বসে ওর জামায় পুথি বসাচ্ছে। দুই চুলার একটাতে বড়বাবুর মুরগির তরকারি বসায়। আরেকটাতে শিদলের কড়াই।রান্নার ভাপ চুলার উপর পাক খেয়ে উড়ে যায় জানালাপানে। ছোট মুরগি কষাতে কষাতেই রান্না হয়ে যায়। এদিকে শোলমাছের তরকারিও হয়ে আসে।একচিমটি ভাজা জিরার গুঁড়ো, একমুঠো ধনেপাতা ছিটিয়ে দিয়ে, শিদলের কড়াইনামিয়ে রেখে ডাল বসিয়ে দেয়।সেদ্ধ আলুগুলো ছাল ছিলে রাখে। মইরোর মা আগেই মরিচ পুড়িয়ে রেখেছে।</p>
<p style="text-align: justify">সুমনা বের হয়ে আসে। সে আলুগুলো পিষেভর্তা করে সেগুলোতে সরিষার তেল ও পেঁয়াজ মেখে একেবারে টেবিলে রেখে আসে। এরপর ভাত বসিয়ে দেয়। ডাল বাগার দিতে হবে।<br />
-মা তুমি রান্না ঘরের বাকি কাম কাজ সেরে গোসলে যাইও। আমি দেখি ঐ লাল মুরগিটা উসমাতি হইছে ওটাকডিম দিয়ে ওমে বসায় দেই।<br />
-আচ্ছা মা, যান। রাহেলা বেগম হরিণ পায়ে গিয়ে বড়বাবুকে একবার দেখে এক খিলি পান মুখে দিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে যায়। সেখানে একপাশে চালডাল সহ যত রকমের হাড়ি কড়াই, বস্তা, আরেকপাশে হাঁস মুরগি, কোয়েলের খাঁচা। মাঝে মাঝে রাহেলা বেগম খড়ির উনুনে রান্না করে সেই খড়ি টড়ি ইত্যাদির ভাঁড়ার ঘর এটি। সেচৌকির নিচ থেকে দশটি হাঁসের ডিম বের করে আনে। মসজিদের পেছনের বাড়ির নুরানী খালার কাছ থেকে মুরগির ডিম বদল দিয়ে হাঁসের ডিম এনেছে। নিয়েছে পনেরটা বদলে দিয়েছে দশটা। গোল একটা মাটির মালসায় আগে থেকেই কাঠের গুঁড়ো রেডি করা ছিল, সেটাতে ডিমগুলি সাজিয়ে রাখে। তার উপর মুরগিটাকে বসিয়ে দেয়। ব্যস, কিছুদিন পরেই দশটা না হোক আটটা বাচ্চা তো ফুটে বের হবে। ভাগ্য ভালো হলে দশটাও হতে পারে।বাড়ির পেছনে একটা খাল আছে।সেখানে যতটা পানি তারচেয়ে কচুরিপানা বেশি। হাঁসগুলো সেখানেই বড় হয়ে যাবে। বড়ছেলে বড়বৌমা হাঁসের মাংস ভীষণ পছন্দ করে। তাছাড়া বড় ছেলে বড় বৌমা যখন আসে, ফিরে যাবার সময় অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে ওদের প্রিয় হাঁস ভুনা করে সাথে দিয়ে দেয় রাহেলা বেগম। জবাই করার মত হাঁস আছে দুটো। আর কয়েকটা আছে এখনও ছোট, খাওয়ার উপযোগী হয় নাই।</p>
<p style="text-align: justify">বাড়িতে বেশকিছু মুরগিও আছে। এছাড়া কোয়েল পাখি পোষে। সেগুলি ডিম দেয়। কেউ পছন্দ না করলেও দুটা খাশিও আছে। বাড়ির পেছনে সামান্য কিছুটা জমি আছে, সেখানে লাউ, সিম, কুমড়োসহ নানান সবজির গাছ আছে। এই লতাগাছগুলি উঠে গেছে আম, কাঁঠাল বা জলপাই গাছের শাখায় শাখায়। লাউ, কুমড়ো, শিম পাড়তে হলে ছোটছেলে তুহিনের দ্বারস্থ হতে হয় অথবা মইরোকে বলা ছাড়া উপায় থাকে না। ওই পেছনের চিলতে জমিতে কাঁচামরিচ, টমেটো, ধনেপাতাও হয়।গাছ পালা ছায়া ঢাকা জায়গা। আম গাছের ডালে কাকের সংসারও আছে, বাবুইয়ের বাসার মত নৈপুণ্য নেই তবুও বাসা। ওরা ডিম পাড়ে, তা দেয়, বাচ্চা ফোটে। রাহেলা বেগম বাইরে এলেই কাকগুলো কা কা করে। খাবারের পর এঁটোকাঁটার সাথে কিছু ভাত মিসিয়ে গাছতলায় রেখে দিলে ওরা খুঁটে খুঁটে খেয়ে নেয়।</p>
<blockquote>
<p style="text-align: justify"><span style="color: #ff0000">ঝুঁটি ওয়ালা লাল মোরগ, প্যাঁক প্যাঁক করা হাঁস, কালোজামের মত গোটা গোটা লাদা নির্গমণ করা ছাগল। ভোর হবার আগে কোয়েলের কোলাহল, কিচিরমিচির, কাকের চিৎকার মোরগের আজান এসবই রাহেলা বেগমের জীবনের অংশ।</span></p>
</blockquote>
<p style="text-align: justify">গোসল সেরে, জোহরের নামাজ পড়ে রাহেলা বেগম ছোট্ট একটা কানাতোলা গোল স্টিলের থালায় ভাত, মুরগির মাংস, সামান্য আলুভর্তা আর একটু জলপাইয়ের আচার নেয়। মাংস আর আচার হলে সে আগ্রহ করে ভাতটুকু খেয়ে নিবে। বড়বাবুর কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে নিজের খুশি প্রকাশ করে নিজস্ব ধরনে। দ্রুতই খাওয়া শেষ করে ফেলে। শেষে কিছুটা ডাল খাইয়ে দিয়ে পরম যত্মে ওর মুখটা মুছিয়ে সে খাবার টেবিলে আসে।</p>
<p style="text-align: justify">এক এক করে সবাই টেবিলে আসে। শাকিল, সুমনা, তুহিন, রিমি, ওদের বাবাও, আজ ছুটিরদিন বলে সে বাসায় আছে। এই ঘরেরই একদিকে দেয়ালের সাথে লাগানো বড়বাবুর খাট। এটি রান্নাঘরের কাছাকাছি বলে ওকে এখানে রাখে রাহেলা বেগম। তাহলে চোখের সামনে থাকে।</p>
<p style="text-align: justify">হালকা কথাবার্তার সাথে চলে খাওয়া দাওয়া।রাহেলা বেগম শোলমাছের মাথাটা রিমির বাবার পাতে তুলে দেয়।দুপুরের খাওয়া হয়ে গেলে যে যার মত ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নেয়। রাহেলা বেগম বড়বাবুর পাশে শুয়ে পড়ে একটা পান মুখে দিয়ে। পান জর্দার ঘ্রাণের মধ্যে ধীরে ধীরে বাচ্চাটি ঘুমিয়ে পড়ে, রাহেলা বেগমের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। দশভুজা রাহেলা বেগম রানুর দিনে ঘুমানোর অভ্যাস আছে। দুপুরে একটু ভাতঘুম না দিলে শরীরটা চলে না।</p>
<p style="text-align: justify">২.<br />
রাহেলা বেগমের চার ছেলে মেয়ে। বড় ছেলে ওয়াকিলুর রহমান। এরপর শাকিলুর রহমান। এরপর তুহিন এবং সবশেষে রিমি। রিমির বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। সংসারে নির্দিষ্ট আয় বলতে রিমির বাবার পেনশনের কটা টাকা।অবসরের পর তিনি ধর্মকর্মে অধিক মনো্যোগী হয়েছেন। মসজিদ তার প্রিয় জায়গা হয়ে উঠেছে।এদিকে খরচের তো লেখাজোঁখা নাই। তুহিন, রিমি দুজনেই কলেজে পড়ে। মেজ বৌমা সুমনাও বিয়ের পরই অনার্স কমপ্লিট করল।</p>
<p style="text-align: justify">মেজো ছেলে শাকিলকে নিয়ে রাহেলা বেগমের অন্তহীন সমস্যা। একে তাকে ধরে ওকে একটা চাকরিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর করার পরই সে সেখানে ঝামেলা করে ফেলে। চাকরি থেকে ডিসমিস তো হয়ই, বাড়তি জেল জরিমানা ক্ষতিপূরণ দিতে ঘরের সঞ্চিত টাকা, রাহেলা বেগমের হাতের চুরি সব চলে যায়। আবার সে যে বেকার সেই বেকারই হয়ে যায়। এদিকে তো প্রেম করে বিয়ে করেছে এক ছাত্রীকে। যাকে আবার লেখাপড়ার খরচ যোগাতে হয়। তিন তিনজনের লেখাপড়ার খরচ, কাপড়চোপড়, হাতখরচ, বাড়ির মাসিক খরচ চালানো দিনদিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ছে। রিমির বাবা অনেক ঘুরে ঘুরে অবশেষে একটা ছোট খাট চাকরি যোগাড় করে নিয়েছেন। কিন্তু শাকিল যা তাই। খায়দায়, ঘুরে বেড়ায়।</p>
<p style="text-align: justify">৩.<br />
রাহেলা বেগমের বড় ছেলে ওয়াকিলুর রহমান ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিল। সে সব ক্লাসেই ভালো রেজাল্ট করত। ঢাকা ভার্সিটি থেকে পাশ করে, এমবিএ করার পর সে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করে। ওর বউও একজন ব্যাংকার। ছেলে বাবা মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করে। মাসে মাসে মায়ের নামে টাকা পাঠায়। ছোট ভাই শাকিল একবার ঠিক করল সে দোকান দিবে, টাকার দরকার। কি করা যায়! কোথায় পাওয়া যায় টাকা! ভয়ে ভয়ে রাহেলা বেগম বড় ছেলেকে বলে। সেই বা আর কত করবে! কিছুদিন পরে বড় ছেলে ঠিকই টাকা পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু সে দোকান পাট শাকিল করতে পারলে তো! কিছুদিন চলার পরই সেসব লাটে উঠে যায়।</p>
<p style="text-align: justify">এই বড় ছেলের সন্তান বড়বাবু। ওর একটি সুন্দর নাম আছে কিন্তু বাসার সবাই আর রাহেলা বেগম বড়বাবু বলেই ডাকে। তারই ধারাবাহিকতায় মেজো ছেলের পুত্র ছোটবাবু। বড় বাবুর বয়স এখন ১২ বছর। সে কোন স্বাভাবিক শিশু নয়। সে শোয়া থেকে উঠতে পারে না।জন্মের পর থেকেই তার স্পাইনাল কর্ড শক্ত হয়নি। কথা বলতে পারে না। তার বাবা মা দেশে তো বটেই বিদেশে বহু চিকিৎসা করিয়েছে। কিন্তু কোন কিছুতেই কিছু হয়নি। সে বাবামায়ের সাথে ঢাকার বাসাতেই থাকত, কিন্তু কাজের লোকের কাছে রাখাটা কতটা নিরাপদ!তাছাড়া কাজের লোক থাকতেও চায় না। আলাপ আলোচনার পরে ঠিক হয় সে দাদীর কাছে থাকবে। গত চার বছর যাবত বাবু দাদীর কাছে থাকে। বাসার সবাই দেখাশোনা, আদর যত্ম করে। সারাক্ষণ ওর কাছে কাউকে না কাউকে বসে থাকতে হয়।যখন যে সময় পায় ওর কাছে থাকে। আর ওর দাদী সবকিছু তীক্ষ্ণ চোখে তদারকি করে।</p>
<blockquote>
<p style="text-align: justify"><span style="color: #ff0000">যতদিন মেজোবউ সুমনার বাচ্চাকাচ্চা হয়নি সেও বড়বাবুর যত্নআত্তিকরত।এখন আর সময়ও পায় না, মনে হয় মনও চায় না।</span></p>
</blockquote>
<p style="text-align: justify">সন্ধ্যা হয়েছে। কেরামতিয়া মসজিদের আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। রাহেলা বেগম অজু করে এসে বড়বাবুর চেয়ারের পাশেই জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। এটি একটি বিশেষ চেয়ার যা সিঙ্গাপুর থেকে আনানো। এখানে বাবুকে বসিয়ে একাধিক বেল্ট দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। মোনাজাতে গিয়ে সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। এই বাচ্চাটির জন্য তার মনে বড় কষ্ট। ওর বয়সী বাচ্চারা খেলছে, দৌড়াচ্ছে, স্কুলে যাচ্ছে&#8230; ওর কপালটাই এমন হওয়া লাগে! বিধাতার এ কেমন বিচার! কেমন খেলা! খেলা নাকি বৈরিতা!<br />
জানে তার বড় ছেলে বড় বৌমার মনেও গভীর দুঃখ। এক অনির্বান জলন্ত হাহাকার।এ এক ক্লান্তিকর জার্নি, কিন্তু কিছু করার নেই।</p>
<p style="text-align: justify">এরকম একটি বাচ্চার দেখাশোনা করাও বিলক্ষণ একটি জটিল ব্যাপার। ওর বয়স বাড়ছে, দিনদিন লম্বা হচ্ছে, সবাইকে ধুমধাম মার বসিয়ে দেয়, পায়ের কাছে কিছু থাকলে বা কেউ গেলে বেকায়দা পা চালিয়ে দেয়। দিনদিন জিদও খুব বেড়ে যাচ্ছে।নিজস্ব পছন্দ অপছন্দ গ্রো করছে। কথা না বলেও নিজের মতামত জানাতে পারে। সবচেয়ে কঠিন কাজ ওকে গোসল করানো। একজন শক্ত হাতে ধরে রাখতে হয় আরেকজন গোসল করাতে হয়। সমস্যা আরো আছে সে নিজের হাত নিজে কামড় দিয়ে রক্তাত্ত করে ফেলে, হাত মুঠি করে নিজের মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করে। তারপরও রাহেলা বেগম আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় ওর নিরাপত্তা, সেবাযত্নের যেন ঘাটতি না হয়।</p>
<p style="text-align: justify">নানান দুর্ভাবনা, পরিশ্রমে আজকাল ক্লান্তি চলে আসেকিন্তু সংসার কি ক্লান্তি ক্ষমা করে? নিজের বয়সটাও তো বাড়ছে।এভাবেই শীত গিয়ে বসন্ত আসে। বসন্ত গিয়ে আবার শীত আসে।</p>
<p style="text-align: justify">দুপুরের আগে আগে রাহেলা বেগম বাজার থেকে ফেরে। নিজের ওষুধ, বাসার প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি, ছোট নাতীর জন্য প্যামপার্স, দুধের টিন, সুজি, মোমবাতি, ডিম ইত্যাদি নিয়ে। বড় নাতির জন্য কিছু আনতে হয়না। বড় বৌমা গাড়ি বোঝাই করে ওর প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে যায়। এত দেয় যে তা দিয়ে বাড়ির অন্যদেরও প্রয়োজন মিটে যায়। সে ফোন করে জেনে নেয় কি আছে কি নেই। ওরা প্রতি মাসেই আসে। মাঝে মাঝে বৌমা ছুটি নিয়ে কয়েকদিন থেকে যায় ছেলের কাছে।<br />
এভাবেই অনেক খাড়াই ভেঙে, অনেক পাথরের দেয়াল উতরে, বরফনদী পেরিয়ে রাহেলা বেগমের সংসার এগুতে থাকে। নাতিরা বড় হতে থাকে। দাদু-দাদীরা ভাটি থেকে আরো ভাটির দিকে হাঁটতে থাকে। ঢাকা-রংপুরের দীর্ঘপথে এক জনম দুঃখী বাবা মায়ের পারাপার অন্তহীন চলতে থাকে।</p>
<p style="text-align: justify">কিছুদিন আগে সুমনা যখন সন্তান সম্ভবা তখন রাহেলা বেগমও খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তখন কথা উঠেছিল যে বড় বাবুকে ওর বাবামা নিজেদের কাছে নিয়ে যাবে। সে ওই প্রস্তাবে কিছুতেই রাজি হয়নি। রিমির বাবা বলেছিল-<br />
-এটাই তো ভালো হবে রানু, তুমি আর কত করবা? ছোট বৌমার শরীর ভালো না, রিমির লেখাপড়া আছে, তুমি নিজেও দিনদিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছ। হাতের ব্যথা, কোমরের ব্যাথায় রাতভর কোঁ কোঁ কর। ওর বাবা মা তো নিজে থেকেই নিয়ে যেতে চাচ্ছে, নিয়ে যাক।এত জিদ করছ কেন! গোঁ ধরছ কেন!<br />
কিন্তু রাহেলা বেগমের এক কথা বাবু কোথাও যাবে না। সে আমার কাছেই থাকবে।</p>
<p style="text-align: justify">সারাদিন অনেক খাটুনি গেছে। মনোরম এক বিকেল গুটিগুটি পায়ে আঁধারের দিকে এগুচ্ছে। হুশহাশ বাতাস বইছে।সন্ধ্যার নামাজ শেষ হয়েছে, রাহেলা বেগম বসে বসে দোয়া দরূদ পাঠ করছে। এমন সময় ছোটবাবু পেল্লাই এক চিৎকার দিয়ে ওঠে। রাহেলা বেগম চমকে কান খাড়া করে। এদিকে ওর চিৎকার শুনে বড়বাবুও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। সেও উচ্চকিত উ! আ! শব্দ করতে থাকে আর হাত পা ছুঁড়তে থাকে। প্রবলবেগে দুদিকে মাথা নাড়ে, মুখ দিয়ে লালা চলে আসে। রাহেলা বেগম একহাত দিয়ে ওর মাথাটা চেপে ধরে থাকে। ওদিকে ছোটবাবু চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। সুমনা গেল কই! বাথরুমে নাকি?। রাহেলা উঠতে গিয়েও পারে না। আজ কোমরটায় বড্ড ব্যথা। বাবু পড়ে গেল নাকি কে জানে! পিঁপড়েও কামড় দিতে পারে। আবার যখন উঠতে যাবে ঠিক তখুনি সুমনা শাকিলের কণ্ঠ শোনা যায়।</p>
<p style="text-align: justify">এবারে, আস্তে ধীরে দোয়া কালাম শেষ করার পর সে উঠে পড়ে। পানের খিলি মুখে পোড়ে। বের হয়ে এসে বারান্দা থেকেই হাঁক দেয়,<br />
-সুমনা বাবুর কি হইছে? পড়ি গেছিল? ব্যথা পাইছে নাকি? অসুমনা! অই শাকিল! কারো কোন সাড়া না পেয়ে সে এসে বড়বাবুর পাশে চুপচাপ শুয়ে পড়ে। আজকাল সুমনার কপালে দিবারাত্র বিষণ্নতার ভাঁজ। সংসারে সুখ অসুখ থাকেই। ঝড়ঝাপটা বিপদ আপদও আসে। আবার এরই মাঝে দখিনা বাতাসও বয়। বড় একটা শ্বাস ফেলে সে।</p>
<p style="text-align: justify">৪.<br />
চাঁদের হিসেব ছাড়াই রাহেলা বেগমের সংসারে ঈদ লেগেছে। ঢাকা থেকে বড় বৌমারা এসেছে। বরাবরের মতো প্রচুর খাবার দাবার এনেছে। সবার জন্য কিছু না কিছু গিফট এনেছে। বড়বাবু ছোট বাবুর একই রঙের ড্রেস। আর এনেছে জন্মদিনের বেলুন, রঙিন পোস্টার, মোমবাতি, সোনালি, রূপালী রঙিন রাংতা আরও অনেক কিছু। আগামীকাল বড়বাবুর জন্মদিন। নিজেরা নিজেরাই পালন করে, বড়জোর দুচার জন বন্ধু কিংবা পাশের বাসার বাচ্চাদের বলা হয়। বাবুটা ঠিকই বোঝে ওকে নিয়েই কিছু হচ্ছে, এইদিন সে মহাখুশি থাকে।</p>
<blockquote>
<p style="text-align: justify"><span style="color: #ff0000">পরদিন রাহেলা বেগম পোলাও, মাংস, রোস্ট, পায়েশ রান্না করে। সবাই মিলে খাবার ঘরটিই বাবুর জন্য সাজানো হয়। রাহেলা বেগম আগেই চিলিজ এ কেকের অর্ডার দিয়ে রেখেছে।</span></p>
</blockquote>
<p style="text-align: justify">দুই বাবুকেই বড়বৌ নুতন ড্রেস পরিয়ে দেয়। দুজনেই দাঁত বের করে হাসতে থাকে। ছোট বাবুর উপস্থিতি বড় বাবু বুঝতে পারে এবং ওকে খুব পছন্দও করে।ছোটবাবু আজকাল দাদিকে, দাদুর অনুকরনে “আ-নু, আ-নু” বলে ডাকে। সেটাই ওকে দিয়ে ডাকানো হচ্ছে আর সবাই তুমুল হাসাহাসি করছে।<br />
একসময়, বেলুন ফুলাতে ফুলাতে তুহিন বলে ওঠে<br />
-আজকে দু-ভাইয়েরই জন্মদিন একসাথে হয়ে যাক। সুমনা ঝট করে মুখ তুলে দেবরের দিকে তাকায়, ধীরে ধীরে চোখে রোষানল ফুটে উঠতে থাকে। হঠাৎ কথার তালে রাহেলা বেগম বলে ফেলে<br />
-হ্যাঁ আর দু মাস পরেই তো ওর জন্মদিন। একদিনেই দু-ভাইয়ের করে ফেললেই তো হয়।<br />
-হ্যাঁ, এক কেকে, এক খরচেই সব হয়ে যায়। ঝঞ্ঝাট ঝামেলাও মিটে যায়। সঞ্চিত রোষ রাসায়নিক কোন এক বিক্রিয়ায় বিষে পরিণত হয়ে নিক্ষিপ্ত হয় সকলের উদ্দেশ্যে।তীক্ষ্ণ কণ্ঠে কথাগুলো বলে সুমনা ছেলেকে বড় জায়ের কোল থেকে টেনে নেয়, হাত থেকে বেলুন কেড়ে ফেলে দেয়। ছেলে এখানেই থাকতে চাচ্ছে,আবার হাতের বেলুন কেড়ে নেয়াতে সে ভ্যা করে কেঁদে ওঠে। চলে যেতে যেতে সে ছেলের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলে ঘরের সবাই স্তম্ভিত হয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা দমকা বাতাস এসে ঘরের পর্দা, জরির ঝালর, বেলুন সব উড়িয়ে নিতে চায়। কিন্তু রাহেলা বেগম ক্ষিপ্র দুহাত মেলে সব রক্ষা করে।<br />
পরে অনেক ডাকাডাকি করেও সুমনাকে আর আসরে আনা যায় না। তবে ছেলেকে ঘর থেকে বের করে দেয়।</p>
<p style="text-align: justify">বিকেলে কেক চলে আসে। বাচ্চারা চলে আসে। বড়বাবুকে কোলে নিয়ে ওর বাবা টেবিলের মাঝখানে দাঁড়ায়। বড়বাবুকে কোলে রাখা মুশকিল দেখে ওর চেয়ার এনে ওকে বসিয়ে দেওয়া হয়। সেটা আবার নিচু হয়ে যায়। এবারে চাচ্চু তুহিন ওকে কোলে নেয় আর ওর বাবা মাথাটা ধরে রাখে। সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে যায়। ছোটবাবুকে কোলে নিয়ে বড়বৌ স্বামীর পাশে দাঁড়ায়। কেক কাটা হয়ে যায়। সবাই হাততালি দেয়। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে শুতে শুতে অনেক রাত হয়ে যায়। না, সুমনা আর বের হয় না।</p>
<p style="text-align: justify">রাহেলা বেগম বোঝে দিনে দিনে সুমনার মনে একটা কালো বাতাসের ঘুর্ণি জমাট বাঁধছে। জমাট মেঘের আড়াল থেকে এক অদৃশ্য তীরন্দাজ বিষের তীর হেনে চলেছে অবিরাম। ভয়ঙ্কর ঝড় ওঠার আগেই ওই ঘূর্ণিটাকে নির্মূল করতে হবে। এসব ছোট বড় আপস, উৎপাটনের নামই যে সংসার।</p>
<p style="text-align: justify">কদিন পরের কথা। ওরা ঢাকায় চলে গেছে। দুপুরের খাওয়া শেষে বাচ্চারা ঘুমিয়েছে। রাহেলা বেগম ভাতঘুমের আরামটুকু জলাঞ্জলি দিয়ে সুমনাকে ডাকে,<br />
-মা, কাপড় পরে নাও তো একটু বাইরে যাব।<br />
-এ সময়ে! বাইরে! বাবু ঘুমাচ্ছে, উঠে পড়লে?<br />
-সবকিছু রিমি দেখবে। তুমি দেরি করনা।<br />
সুমনাকে নিয়ে সে রিকশায় ওঠে পড়ে।</p>
<p style="text-align: justify">বাইরে গড়াগড়ি খাচ্ছে রোদ্দুর। মেঘহীন আকাশ অনেক উঁচুতে উঠে আছে।রিকশা শ্যামাসুন্দরি খাল পেরিয়ে চলতে থাকে। শাশুড়ি বৌমাকে বলে এই খালের ইতিহাস জানো মা? বলে নিজেই বলতে থাকে- “ডিমলার দানশীল রাজা জানকী বল্লভ সেন তার মা ‘শ্যামাসুন্দরি’র স্মরণে এই খাল খনন করেছিলেন। আমাদের দেশে এমন খাল আর একটাও নেই। এটি ১৬ মাইল দীর্ঘ আর ৪০ থেকে ১২০ ফুট চওড়া। এটি ঘাঘট নদীতে গিয়ে মিশেছে”। ছোটবেলায় পড়ছিলাম মা।</p>
<p style="text-align: justify">শহরের, পার্কের, অবাক হওয়ার মত বিশাল মহীরুহগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। এ যেন আগুনের লকলকে ক্ষুধিত জিভ। জারুল, কৃষ্ণচূড়া ফুলে ছেয়ে আছে চারপাশ।একঝাক শালিক ঘোরাঘুরি করছে। একাকী দুপুর কাঁদছে পাতার আড়ালের ঘুঘুর গলায়। নির্দেশমত রিকশা চলে আসে শিরিন পার্কে।</p>
<p style="text-align: justify">রাহেলা বেগম দূরের একটি বেঞ্চের দিকে এগুতে থাকে।দুপুরবেলা পার্কে তেমন মানুষজন নেই। তাই বলে নিবিড় নির্জনতাও নেই। দুজনে বসে পড়ে। রাহেলা বেগম বাদাম ওয়ালাকে ডাক দেয়। কিছু বাদাম নিয়ে দুজনের মাঝখানে রেখে বলে<br />
-বাদাম খাও। অবাক হবার কিছু নাই। তোমাকে একান্তে কিছু কথা বলার জন্য এখানকার এই নিরিবিলিতে আসছি। আমি যা বলব তুমি মন দিয়া শুনবা। কিছু বলার থাকলে পরে বইলো। শোন সুমনা, সংসার বড় কঠিন জায়গা। কেবল কঠিন না জটিলও। আমার মেজো ছেলে মানে তোমার স্বামী একজন বেকার মানুষ, আয় রোজগার কিছু নাই। এটা তোমার মাথায় থাকা দরকার। একথা সত্যি আমি বড়বাবুর পেছনে সময় দেই, মনোযোগ দেই তাইবলে তোমার মনে করার কোন কারণ নাই আমি আমার ছোট নাতিকে কম ভালোবাসি। দুজনেই আমার বংশধর, আমারই রক্ত। তুমি তোমার বড় আপার সাথে একদিন বলাবলি করছিলা যে অমন লুলা গুঙ্গা বাচ্চার দেখাশোনা করা ঠিক নয়। নিজে বাচ্চা নেওয়া দরকার। তোমরা বাচ্চা নিলে। যেখানে তোমার স্বামীর একপয়সা কামাই নাই, সে গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে চলে, তোমরা বাচ্চা নেও কোন আক্কেলে!</p>
<p style="text-align: justify">আমার গুণধর মেজোছেলে তোমার মতো এক ছাত্রীকে বিয়ে করে আনলো যখন তোমার পুরা অনার্স পড়ার খরচ কে যোগাইছে?<br />
বাড়িতে কাজের মহিলা মইরোর মাকে কে রাখছে?<br />
প্রতিমাসে এত এত খাবার দাবার দিয়ে যায় কে?<br />
বাবা মায়ের প্রতি যে দায়িত্ব,তা পালন করে আমার বড় ছেলে। এটা ছেলের দায়িত্ব। বৌমার তো কোন দায় এখানে নাই। তারপরও সে করে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত করে। কেন করে? বোঝ?<br />
নির্মম হলেও, বাস্তবতা হচ্ছে যার বাবার আয় রোজগার নাই, তার পাছার নিচে ত্যানাও জোটে না। কিন্তু আমি আমার ছোট নাতির জন্য প্যাম্পার্স কিনি আনি, যেহেতু বড়বাবু প্যাম্পার্স ব্যবহার করে। কিন্তু তুমি তো জান আমি কোন আয় করিনা।তাহলে? হিসেবটা বোঝার চেষ্টা কর।<br />
আমার ছোট ছেলের এখনও লেখাপড়া শেষ হয় নাই, আমার মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, আমার মেজো ছেলে বেকার কাজেই মা আমাকে তো ভেবেচিন্তে, কৌশলে পা ফেলতে হয়।</p>
<p style="text-align: justify">বড়নাতির জন্য আমার মনে গভীর দুঃখ আছে, মায়া আছে, দাদী হিসেবে কিছুটা দায়িত্বও আছেএকথা সত্য কিন্তু তারচেয়েও বড় সত্য ও আমার সংসারে আশির্বাদ।আর সে আশির্বাদে আমরা সবাই, হ্যাঁ সব্বাই সে আশির্বাদে পুষ্ট।<br />
তোমার আর তোমার বোনের যে ভাবনা, যে ভাষা, তারউলঙ্গ প্রকাশ করে আমাকে বলতেই হয়,<br />
“হ্যাঁ ওই লুলা গুঙ্গাই আমার সংসারে সোনার ডিমপাড়া হাঁস”।শাশুড়ি বৌয়ের মাঝখানে বাক্যটি যেন পাক খেতে থাকে।একনাগাড়ে কথা বলে রাহেলা বেগম থামে, তার দুচোখে জলের ধারা। সুমনার থুঁতনি আরো বুকের সাথে লেগে যায়। রাহেলা বেগম এতক্ষণও গলা উঁচু করে নাই, এবারেও ততধিক নরম, নির্মোহ স্বরে জিজ্ঞেস করে<br />
-তুমি কিছু বলবে মা?<br />
সুমনা মাথা নাড়ে। ওর কিছু বলার নেই।</p>
<p style="text-align: justify">ফিরতি রিকশায় কেউ কোন কথা বলে না। পার্কের গেট থেকে নাতিদের জন্য রঙ বেরঙয়ের গ্যাস বেলুন কিনে নিয়েছে। রিকশা যখন বাড়ির সামনে আসে একটা অ্যাম্বুলেন্সে সাইরেন বাজাতে বাজাতে দ্রুত পাশ কেটে বের হয়ে যায়। রাহেলা বেগমের কপাল কুঁচকে যায়। কয়েকটা বাড়ির বহিরাঙ্গন এই জায়গাটুকু। তাড়াতাড়ি ভাড়া মিটিয়ে পা বাড়াতে যাবে শাক বিক্রি করা বুড়িটা চিৎকার দিয়ে ওঠে-<br />
-অ বুজান! খাট থাকি পড়ি, তোমার নাতির মাতা দুই ফাঁক হয়া অক্তের নদী হয়া গেইচে&#8230;আল্লাক ডাকাও বুবু, আল্লাক ডাকাও&#8230;<br />
কোথায় যেন উচ্চারিত হয় হে সান্ধ্যগ্রন্থি, হে আজানকাল, হে সংসার আমাকে আর মেরো না, মরা বাঁচার গাঢ় বেদনার অবিরাম ভার বইতে আমি অক্ষম।<br />
সংসারী রাহেলা বেগমের মাথায় মুগুরের ঘা মারতে থাকে কোনজন? বড়বাবু? নাকি ছোটবাবু? কে?</p>
<div style="margin-top: 0px; margin-bottom: 0px;" class="sharethis-inline-share-buttons" ></div>]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://www.jogsutra.com/2021/05/13/%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a5%a5-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a7%80-%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%af/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
	</channel>
</rss>
