এই যে একজীবন পরিক্রমায় এতটা হাঁটছি, হাঁটতে হাঁটতে আমার কোথাও কি যাবার কথা ছিল? কোন দীর্ঘ অপেক্ষা কারো জন্য, কেউ কি গন্তব্য ছিল? হয়তো নেই, ছিলও না, অথচ অবচেতন মন কখনও দৌড়ে, কখনও শ্লথ পায়ে।
চলতি পথে কত মানুষের মুখ। প্রিয়, অপ্রিয় চেনা অচেনা দেখি চিনি না। দেখিনিও হয়তো তাও কত ভালোবেসে ফেলি মানুষকে।মোড়ের মাথার অল্পচেনা দোকানদার; জলের কলে লাইন দেওয়া কত মানুষ; হকারের চিৎকার, অন্যমনস্ক পথচারীরা ; পুজোর জন্য ফুল তোলে রাস্তার ধারে যে মাসী তাকে আমি ফুলমাসী ডাকি।
কি যে খুশি হয়! চোখে নেচে যায় স্নেহময় ভালোবাসা। ভালোবাসি সব্বাইকে! রোজ ভোরে কাপে টুংটাং শব্দ করে যে ছেলেটা গরম জলে টি ব্যাগ ফেলে চা বানায়, তার মুখটাও কত মায়াময়।
ছুটছে মানুষ এ পথ ধরে সে পথে। তেপান্ন গলি পেরিয়ে জীবনকে এ ফোঁড় ও ফোড়ে জোড়া লাগিয়ে কখনও টেনে হিঁচড়ে। মায়ায় প্রেমে, অপ্রেমে কখনও সয়ে যাওয়া সহনশীলতায়..
কেন এভাবে ছুটছে মানুষ?
সময়কে ভরে নিয়েছে হ্যান্ডব্যগে, কেউ সামান্য খুচরো কিছু কয়েনে! এই যে পি টি আই মোড়, রয়েল মোড়, খুব পরিচিত পাড়াগুলো, দীর্ঘ দেখায় বড় হওয়া অশত্থ গাছ, ছোট্ট বকুল চারার পরিণত বড় হওয়া। সময়ের ক্লেদকে বেঁধে রেখে তারাও ছুটছে।
কারো জন্য কারো ততটা সময় কি আছে যতটা সে নিজের জন্য খোঁজে? শ্রাবণ তো সেদিন এলো কৃষ্ণচূড়ার ডালটায় জল জমিয়ে কচুর পাতার টলটলে জলে, চলে যাবার তারও সময় ঘনিয়ে।
শ্যাওলা জমা একাকী বেঞ্চগুলো খুঁজছে সেসব মানুষের নিঃস্বার্থ নির্বাক স্বচ্ছ মুখ।
অথচ হতে পারতো মানুষের মুখগুলো আয়নায় এ পিঠ ওপিঠ একই রকম! তারপরও ভালোবাসারা আমার ইজেলে রঙের মতন ছড়িয়ে যায়। ভালোবেসে ফেলি যাবতীয় অনুযোগের সমুদয় সব অন্তরায় কে। যা কিছু নিজের নয় অথবা নিজের ছিলওনা কখনও। মানুষের মতো মানুষ খুঁজে হারিয়ে যায় কত মানুষ..বৃত্তের কেন্দ্রে সব মানুষের একই রূপ।অযাচিত অথচ বিবর্ন নিশ্চুপ!
কোথায় যেন পড়লাম-নিঃশব্দেরও রয়েছে শত শব্দ ঋণ।নিউরন খুব শক্ত করে গেঁথে নিয়েছে কথাটা। কথারও তো ঋণ আছে। আছে স্মৃতি জমানো জারের ভারসাম্য নিয়ে তোলপাড়।
হঠাৎ সব ঝনঝনিয়ে ভেঙে পড়ে। দুলে ওঠে পর্দা, নিকষ কালো অবয়বে ফিরে যায় তারাই ছেড়ে গ্যাছে যারা শেষবার। হাকিম স্যারের পড়ানো রসায়ন সুত্র; হাঁসভাসা স্বচ্ছ জলপকুর দোচালা ঘর, বাতাবি ফুলের মৌ মৌ গন্ধ। কে যেন বারবার ডেকে নিয়ে যায় কাদামাটির সে পথে: দুই ধারে পাতাবাহারের চটক। জল পড়ছে অবিরত; আকাশ ভেঙে পড়ছে নবঘনে তিলঠাঁই নেই কোথাও..
কেউ তো নেই কোথাও
জল গড়িয়ে মনজানালায়, বাবা!
তোমার সেই যে নীল শার্ট!
মৃদু হাসি অথচ কি রাশভারি গম্ভীর মুখটা!
পথটা শেষ হয়নি-কতদূর আরও.. কখনও ক্লান্তিহীন নিশ্চুপ! দূর কোথাও টিমটিম আলো জ্বলছে.. করুন কোন চেনা সুর..
আছো কি তুমি কোথাও? সেই একজীবনের একমাত্র নির্ভরতার কাঁধ!


