বিদায় বেগম জাহান আরা ॥ কুলদা রায়


বেগম জাহার আরা

জাহান আপা চলে গেলেন। আজ। ৮৬ বছর বয়সে। চার বছর আগে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। ছিলেন ভাষাতাত্ত্বিক। বাংলা একাডেমির বানান সংস্কার নিয়ে তাঁর কিছু ভিন্ন মত ছিল।নিজেও লিখেছেন ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে বইপত্র।অবসরে যাওয়ার পরে তিনি বেশ কিছু কাজ করতে চেয়েছিলেন।কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বাংলা একাডেমি তাঁকে কাজে লাগাননি।এই দুঃখের কথা বলেছিলেন।

এর বাইরে তিনি গল্পও লিখতেন।সেটাই আমাকে আকর্ষণ করেছিল। তখন গল্পপাঠ ওয়েবজিনের অনুবাদক টিমের জন্য লোকজন খুঁজছিলাম আমরা।

তাঁকে ফেসবুক মেসেঞ্জারের নক করেছিলাম ২০১৯ সালে। অনুরোধ করেছিলাম গল্প অনুবাদ করতে। তিনি কখনো গল্প অনুবাদ করেননি। কিন্তু আমাদের অনুরোধে রাজীও হলেন।বলেছিলেন অনুবাদের জন্য ছোট কোনো লেখা পাঠাতে।তিনি বেশ যত্ন করে অল্প দিনের মধ্যেই অনুবাদটি পাঠিয়েছিলেন।

তারপর থেকে তিনি নিজেই আমাদের টিমের একজন হয়ে উঠেছিলেন। এরপর তিনি নিয়মিত অনুবাদ করেছেন।গল্প লিখেছেন গল্পপাঠ ওয়েবজিনে।কোনো কারণে ফোন করতে দেরি হলে অভিমান করে সুধাতেন, আমাকে ত্যাগ করলে দাদু?

অশীতিপর বলে আমরা আমরা সবাই তাঁকে বিশেষ সমীহ করতাম। তিনি নাহার তৃণাকে বলতেন মেয়ে। তৃণা বলতেন–মা। আমাকে বলতেন দাদু। কিছুদিনের মধ্যেই বায়না ধরতেন তাঁকে যেন বেশি বেশি অনুবাদের কাজ দেই। কাজ থাকলে তিনি ভালো বোধ করেন। কাজ না থাকলে তাঁর মৃত্যু ভয় আসে।এই হেতু তাঁর জন্য কাজ খুঁজে রাখতে হতো আমাদের।

দীপেন ভট্টাচার্য দাদাকে আমাদের মতোই দীপেনদা বলতেন।
তাঁর ইচ্ছে ছিল ভাষাতত্ত্ব, বানানবিধি–নিয়ে বিস্তারিত ভাবে কথা বলবেন। সেজন্য তিনি উপযুক্ত প্রশ্নকর্তা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন ড: পবিত্র সরকার হলে ভালো হয়। আমরা কাজটি করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করি।

এ সময়টা ছিল করোনাকাল।এরপরে তিনি জার্মানি থেকে দেশে–ঢাকায় ফিরে এলেন। ধানমণ্ডিতে বাসা নিলেন। লুতফুন নাহার লতা আপার সঞ্চালনায় একটি অনলাইন আড্ডার আয়োজন করা হলো।২.৩০ ঘণ্টা ধরে স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলেছিলেন নিজের সম্পর্কে। নিজের পেশা সম্পর্কে।বলেছিলেন নিজের লেখালেখি ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বিষয়ে। সেদিন তার গৃহবধু থেকে পড়াশুনা, অধ্যাপনা, গবেষণা জীবনের লড়াইয়ের আখ্যান শুনে আমাদের চোখে জল এসেছিল।শ্রদ্ধায় নত হয়েছিলাম।

সেদিন পরেছিলেন শাড়ি। হাসি হাসি মুখ। গলায় মুক্তোর মালা। কানে সাদা দুল। দিব্যি সরস্বতী ঠাকুরুণ।

ঢাকায় ফিরে দু দুবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।নিউমেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছিলেন।সেই অসুস্থ অবস্থায়ই ফোন করে বলতেন, আমার জন্য অনুবাদের কাজ পাঠাও। কাজ পেলেই আমি আবার সুস্থ হয়ে ফিরে আসব।

বেশ কিছুদিন ধরে আমি পড়াশুনা, নতুন চাকরি নিয়ে বেশ ব্যস্ততার মধ্যে যাচ্ছি। খুব বেশি যোগাযোগ করার সময় পাই না।এর মধ্যে গেল সপ্তায় জাহানারা আপার ফোন পেলাম। হাসপাতাল থেকে ফিরছেন। ফিরেই কাজ চাইছেন। আমি তখন অফিসে। বললাম অফিস শেষে ফোন করব।

যখন ফিরেছি তখন তাঁর রাত।আবার হাসপাতালে চলে গেছেন।ফোনে আর কথা হয়নি।ইসাবেলা আয়েন্দের গল্প পাঠাবো ভেবেছিলাম।তাঁকে ফিরে পেতে চেয়েছিলাম।তার দুটি বই বের করার পরিকল্পনা করেছিলাম আমরা।

ফোনটি করার আগেই আজ তিনি চলে গেলেন। ফিরিয়ে আনার সুযোগটি পেলাম না। কানাডা থেকে আমাদের রঞ্জনা ব্যানার্জী খুব বিমর্ষ গলায় এই খবরটি জানালেন।

যাওয়ার কদিন আগে লিখেছিলেন–
‘কাল হামবুর্গের হাসপাতাল থেকে বাড়ি এলাম ২৯ দিনপর। মাঝে একদিন বাসায় ছিলাম।কি থেকে কি হলো জানি না। রাতগুলো ছিল বিভিষীকায় ভরা. ।আরোপিত অমিয়ধারা ফোঁটায় ফোঁটায় শরিরে যেতে দেখেছি।নিস্তব্ধ গভীর শীতল থমথমে রাত। কখন ঘুম কখন জাগরন, কিছু মনে নেই। পৃথিবির পর্যটন এবার শেষ হলো মনে হয়। খুব কাহিল । সবার জন্য ভালবাসা।’

প্রিয় অধ্যাপক জাহানারা বেগম, আপা, আপনাকে আমরা কখনোই ত্যাগ করব না।
আপনার যাত্রা শুভ হোক।

[লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া]