৭. ঈদটা গেল কই! কোনো কোনো বিজন বিকেলে মনে হয়, দিনের শেষ আলোটুকুর মতো জীবনের সবকিছু ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। আর এই ফিকে সময়কে দেখতে আজকাল চোখে চশমাও পরতে হচ্ছে। মাঝেমাঝে বেখেয়ালে ‘চশমাটা খসে গেলে মুশকিলে’ও পড়ছি। এই বয়সের মুশকিল সমাধানযোগ্য নয়, অথচ একটা সময় ছিল যখন খুব সহজেই যেকোনো মুশকিল আশান হয়ে যেতো।
এই যে সেই সময়ের জন্য এত হাহাকার করছি, সত্যিই কি সেই সময়টা এত ঝড়ঝাপটা বিহীন ছিল? বয়সের বিড়ম্বনা এখন যেমন আছে তখনও কি ছিল না?
উত্তর হলো, ছিল। শৈশব কৈশোরের অন্যতম বিড়ম্বনা বা একমাত্র দুঃখ যা-ই বলি না কেন, সে ছিল আমার পরাধীনতার দুঃখ। এই পরাধীনতার আগল ভাঙতো ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে দাদাবাড়ি কিংবা ঈদের ছুটিতে নানাবাড়িতে পৌঁছালে।
এখনকার ছেলেমেয়েদের মতো তখন আমরা উইকেন্ড বা ভ্যাকেশন বুঝতাম না। আমরা বুঝতাম দিন গুনতে গুনতে বৃহস্পতিবার পেরিয়ে আসা শুক্রবারের ছুটি, গরমের ছুটি আর ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা শেষের ছুটি।
ছুটি মানেই ছুটোছুটি, আনন্দ। ঈদের ছুটিতে নানাবাড়ি-দাদাবাড়ি যাওয়ার সুযোগ পেলে তো এই আনন্দের কোনো সীমা থাকতো না।
সে ছিল এক হৈ হৈ রৈ রৈ বাঁধনহারা সময়। চারদিকে স্বজন-প্রিয়জন আর খুশি খুশি আনন্দ!
ঈদ অর্থও আনন্দ। ঈদ-উল-ফিতর, ঈদ-উল-আজহা…এসব বিন্যস্ত নামে আনন্দ সংজ্ঞায়িত হতো না আমাদের মুখে। আমরা বলতাম রোজার ঈদ, কুরবানির ঈদ।
সেই ঈদ কি আর এমনি এমনি আসতো! ত্রিশ রোজার সংযম শেষ হয়ে মেহেদি রাঙানো চাঁদ রাত পার হলে তবেই না ঈদ আসতো। তবে আমাদের শৈশব-কৈশোরে রোজার মাস এসেছে তা চাঁদ দেখার চেয়েও নিশ্চিতভাবে বলা যেতো বিটিভির সংবাদ পাঠিকাদের দেখে। রোজা এলেই সংবাদ পাঠিকাদের মাথায় মৌসুমি ঘোমটা উঠতো, আর চাঁদ রাত এলে সেই ঘোমটা গায়েব হয়ে যেতো।
শুনেছি কালে কালে সবকিছুর বদল হলেও বিটিভির বদল হয়নি। আজও এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায়নি বিটিভি। বন্ধুরা বলে, সবকিছু বদলে গেলেও বিটিভি কোনোদিন বদলাবে না।
অনিঃশেষ স্বার্থপরতা নিয়ে ভাবি; না বদলাক, কিছু জিনিস স্মৃতির মতো চিরায়ত হয়ে থাকুক, যেমন আছে পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখার পর বাবার শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ‘খোশ আমদেদ মাহে রমজান’ বলার স্মৃতি।
মনে পড়ে রমজান মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথে বাসার প্রত্যেকটি মানুষের দিনলিপির পরিবর্তন ঘটত। তারাবির নামাজ পড়া, কাফেলার ডাক শুনে ঘুম ভেঙে উঠে সেহরি খাওয়া, মা-বাবার কোরআন শরিফ পাঠ, ইফতারের আয়োজন…সব মিলিয়ে আশ্চর্য সব সুরেলা মুহূর্ত ঘিরে থাকতো আমাদের।
এই সুর অদৃশ্য চেইনে আটকে দিতো প্রতিটা পাড়া, মহল্লা, অলি-গলির বাসিন্দাদেরও। তারাবি নামাজের ওয়াক্তে মসজিদে মসজিদে মুসল্লীদের জমায়েত বাড়তো। মাঝরাতে তারাদের সঙ্গে জেগে থাকতো একদল অত্যুৎসাহী যুবক। গলিতে হেঁটে হেঁটে তারা সুর করে হামদ-নাত গেয়ে বেড়াতো…’কে কে যাবি মদীনায়…।’ এখনকার মতো রেকর্ডারের যান্ত্রিক ডাক ছিল না তখন, থেকে থেকে এই কাফেলাই সমস্বরে আহ্বান করতো, ‘উঠুন, জাগুন, সেহরি খাওয়ার সময় হয়েছে…।’
চোখ কচলে কষ্টে-সৃষ্টে আমরাও উঠতাম। ঢুলু ঢুলু চোখে সেহরি খেতাম। সেহরির সময় শেষ হওয়ার সতর্কবার্তা হিসেবে মসজিদ থেকে তীক্ষ্ম সাইরেন বেজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে পানির গ্লাস টেবিলে ঠুকে দিয়ে নতুন করে সময় গণনা শুরু করতাম। দিন যেতো দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, ইফতারের সময় কখন হবে!
ঐ বয়সে সব রোজা রাখতে পারতাম না। পরীক্ষা না থাকলে একটা দুটো রোজা করার অনুমতি পেতাম। বাবা বলতো, রোজা রাখতে রাখতেই অভ্যাস হবে। না খেয়ে থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা ঐ বয়সে তো সহজ ছিল না। তাই রোজা থাকাবস্থায় এক চুমুক পানি খাওয়ার গোপন আকুতি বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির বড়দের সামনে প্রকট হয়ে পড়তো। মাঝে মাঝে মা ভুলানোর চেষ্টা করতো, এই তো দুইটা বেজেছে-একটা রোজা হয়েই গেলো, বেশি কষ্ট হলে রোজা ভেঙে ফেল।
ওদিকে ভাইয়ের সঙ্গে অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছে, বিছানায় পেট পেতে ঘন্টা দুই শুয়ে থাকা যাবে তবু কোনো প্রলোভনে রোজা ভাঙা চলবে না। পাশের বাসায় ইফতারির থালা দিতে গেলে কণা…শান্তাকে জানাতে হবে, এই নিয়ে আমার দুটো রোজা হলো!
এভাবে রমজান মাসের একেকটা দিন গড়াতো আর মাথার ভেতরে ঘুরপাক খেতো অজস্র দুশ্চিন্তা… রোজা শেষ হয়ে যাচ্ছে আর ঈদের দিনক্ষণও এগিয়ে আসছে! নতুন জামা-জুতো কবে আসবে! বাবা ছুটি না পেলে তো ঈদে নানাবাড়ি যেতে পারবো না! নানাবাড়িতে না যাওয়া হলে ঈদের কী হবে! আনন্দ তো বৃথা যাবেই, হাত ভরে মেহেদিই বা পরবো কী করে!
পরের পর্ব পড়ুন : চাঁদ রাতের মেহেদি…আর ঈদ


