মায়ের জন্য ভালোবাসা ॥ শারমিন রহমান


আমি আমার মাকে ভালোবাসি, এটা বুঝতে অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে আমার।জীবনের অনেকটা সময় পার করার পর বুঝেছি , মা’কে কতটা ভালোবাসি আমি!

মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব বেশি ভালো ছিল না অথবা মায়ের ভূমিকা খুব বেশি টের পাইনি যতদিন আব্বু বেঁচে ছিলেন।মাকে বরাবর রাগী, কড়া মানুষ হিসেবেই দেখেছি।পড়ালেখার বিষয় মা-ই দেখতেন। তাই মা নয়, বাবাই প্রিয় মানুষ ছিলেন আমার।বাবা বকে না, যা চাই, তাই এনে দেন।আর মা বোঝায় সংসারের কষ্ট বুঝতে হবে তো।অভাব না বুঝলে সন্তান মানুষ হয় না।বাবা-মায়ে মধ্যে তর্ক এই নিয়ে।মাকে তখন সিনেমার খলনায়িকাই মনে হতো।বেড়াতে যাওয়ার দরকার নেই সামনে পরীক্ষা, রেজাল্ট কেন ভালো হলো না, এতে টিভি দেখার কী আছে,সমাজ সংসার বোঝাতে চাইতেন।আমি তখন ফড়িং অথবা দোয়েলের জীবনের মতো মুক্ত, স্বাধীন!

জীবন আমার কাছে রঙিন,সবুজ।মনে হতো সবার মা আমার মায়ের চেয়ে বেশি ভালো৷টিভি দেখলে রাগ করে না।নানু বাড়ি বেড়াতে গিয়ে কতদিন থাকে! আর আমার মা শুধু পড়া পড়া করেন।একটা রাত নানুবাড়ি গিয়ে নিজেও থাকেন না, আমাদেরও যেতে দিতে চান না।

কিন্তু, হঠাৎ আব্বু যেদিন কোনো কিছু বোঝার আগেই চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে, সেদিন চারপাশের চেনা মানুষ এমনকি চেনা পরিবেশ, মায়া, স্নেহ; সব বদলে গেলো।সেদিনই বুঝলাম আমার সেই সিনেমার খলনায়িকা মায়ের অবদান আমাদের জীবনে কতটা!

একটা জীবনের পুরোটাই নিজেকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে আমাদের জীবনকে আলোকিত করছেন মা।এখনো করে যাচ্ছেন।একজন মানুষ এত বেশি আত্মত্যাগ করতে পারে, তা আমার মাকে না দেখলে অজানাই থেকে যেতো।বাবা মারা যাওয়ার পর অর্থনৈতিকভাবে এতটাই খারাপ অবস্থা হয়ে যায় যে, আমাদের জীবন চলাই দুর্বিষহ হয়ে পড়ে।কাছের মানুষগুলো দূরের হতে হতে আবছা মূর্তি হয়ে যায়৷একজন শিক্ষক হয়েও আমার মা কখনো দর্জি, কখনো মুরগি-হাঁসের খামারের মালিক, কখনো টিউটর, কখনো সবজি চাষি হয়েছেন।তবু আমাদের গায়ে আঁচ লাগতে দেননি।কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি কখনো।কত অল্প টাকায় সংসার চালানো যায়, তা আমার মায়ের কাছে শিখেছি।কোনো টাকা নেই; তবু সব চলছে।

আমার মায়ের সুপার পাওয়ার আছে।ভাত কম থাকলে তার ক্ষুধা লাগে না, গ্যাস হয়।অথবা তার অনেক জামা কাপড় আলমারি ভরা।তার লাগেই না কিছু।সেগুলো শুধু আমরা দেখতে পাই না।আমাদের চার ভাই-বোনকে মাছ খাওয়ানোর জন্য তার লেজ যে কখন প্রিয় হয়ে গেলো বুঝিনি।আমরা জানতাম, আমার মা মাছের লেজ ছাড়া খান না।প্রথম দিকে লেজই তুলে রাখতাম মায়ের প্রিয় বলে।পরে বুঝলাম মাছের লেজের কাটা বেছে খেতে আমাদের কষ্ট হবে বলে মায়ের লেজ প্রিয় হয়ে গেছে।সারাক্ষণ আমাদের প্রিয় খাবার রান্না করতে করতে যে মানুষটাক নিজের পছন্দ আজ আর মনে করতে পারেন না, তিনিই আমার মা।

আমাদের যে খাবারটা প্রিয়, সেটা তার পুরোপুরি অপছন্দের।বলবে, ‘আরে এটা কোনো খাবার, আমার বমি পায় এটা খেলে।’ অনেক দেরিতে হলেও বুঝেছি, আমার মা না খেলে ওই খাবারটা আমরা আরেকবার খেতে পাবো বলেই সেটা তার অপ্রিয় খাবার।

বাবা চলে যাওয়ার কিছুদিন পর, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়ার দিন কাছে চলে আসছে, টাকা নেই; কী করবো! মায়ের চুড়ি আর কানের দুল খুলে দিলেন আমাকে।সোনার দোকানে জমা দিয়ে আমার ঢাকা যাওয়ার ব্যবস্থা হলো। আমার মেসের চারতলায় চাল, সবজি, মাছের বস্তা টেনে নিয়ে তুলতেন মা।আগে জানালে আমার ব্যাগ টানতে কষ্ট হবে বলে না জানিয়েই চলে আসতেন।এই আমার মা।

এখনো লিখতে বসলে বা ঘুমিয়ে থাকলে কোনো শব্দ না করে চুপিচুপি উঠে কাজ করতে থাকেন, যেন টের না পাই।আমাদের ঘুম বা পড়ায় কোনো ব্যাঘাত না হয়।এই আমার মা।এতটা মনের জোর, সংগ্রাম করার ক্ষমতা শুধু আমার মায়েরই আছে।

মা কয়েকদিন গেলেই আমাকে বলতে থাকেন, কী রে তুই কিছু লিখছিস না? নতুন কোনো লেখা শুরু করিসনি? আর আমাকে লিখতে দেখলে কোনো কথা না বলে নীরবে কাজ করে যান, কোনো শব্দে যেন আমার লেখার মনোযোগ নষ্ট না হয়! রাত জেগে লিখলে কোনোদিন, যেন কোনো কারণে মার সকাল সকাল ঘুম না ভাঙে, সেই চেষ্টা করেন। আমার পাশ থেকে উঠে যান প্রায় নিঃশব্দে, ঘর ঝাড়ুও দেন কোনো শব্দ না করে।তারপর দরজাটা টেনে বাইরের কাজ করেন।

খাবার হয়ে গেলে ডাকতে আসেন।আমায় ডাকোনি কেন? জানতে চাইলে সত্যি গোপন করে বলবেন, আমিই তো একটু আগে উঠলাম! মায়েরাও মিথ্যে বলে, সেটা হয় ভালোবাসা লুকানোর জন্য।অনেক পরে হলেও বুঝতে পেরেছি মায়ের চেয়ে এমন বন্ধু কেউ হতে পারে না।খুব ভালো সময় কাটছে আমার মায়ের সঙ্গে।আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ওএটা। সবাই ছেড়ে চলে যায় একসময় প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা না করে, একদম একা সময়ে, বন্ধুহীন পরিবেশে পাশে থাকে শুধু মা! মা পাশে থাকলে আমিও পারবো, সব প্রতিকূলতাকে জয় করতে।এটা আমার বিশ্বাস।

এসএসসি পাসের পর আমার বাবা-মা ভালোবেসে বিয়ে করেন। বাবা বেঁচে থাকতে এই গল্প কতবার শুনেছি।ভীষণ ভালো লাগতো শুনতে। বাবা পড়াটা চালিয়ে গেলেও মায়ের পড়াটা আর হয় না।মা ১৯৮৪ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।এরপর পুরোটা সময় কেটেছে তার সংসারের কথা ভেবে।

আমার দাদা-দাদু প্যারালাইজড ছিলেন, তাদের দেখাশোনা করা, সংসারের সব কাজ সামলে আর হয়ে ওঠেনি পড়ালেখা।মাকে কখনো পাঁচ মিনিট দেরিতে স্কুলে যেতে দেখিনি।এখনো কোথাও যেতে হলে তিনি সবার আগে তৈরি হন।আমাদের অলসতা দেখে বিরক্ত হন।এতকিছুর পরেও মায়ের মনে পড়ালেখার একটা আকাঙ্ক্ষা এবং মেধাবী ছাত্রী হয়েও পড়তে না পারার দুঃখ ছিল।মাঝে মাঝেই তার কথায় আমি সে দুঃখ বুঝতে পারতাম।যুগ পাল্টেছে।তার সহকর্মীরা সবাই কত পড়ালেখা জানেন, এসব ভেবে কষ্ট পেতেন মা।

একদিন গল্প করে বললাম, মা তুমি ভর্তি হবে? মুখে না বললেও বুঝলাম মা চাইছেন।তবে লোকে কী ভাববে, সেই বিষয়ে লজ্জা পাচ্ছেন। আমি শুরু করলাম মাকে পজিটিভলি বোঝাতে।এরপর মায়ের কলেজ জীবন শুরু।যেদিন মায়ের প্রথম পরীক্ষা ছিল।ইংরেজি দিয়ে শুরু হয়েছিল। আমি সঙ্গে নিয়ে গেছিলাম।পরীক্ষা শুরু হলে বাইরে বসে আমার সে কী চিন্তা! বুঝেছিলাম, একদিন আমার মায়েরও আমার পরীক্ষা নিয়ে ঠিক এমন চিন্তা হয়েছিল। সে এক অন্য অনুভূতি। মা এইচএসসি খুব ভালো নম্বর নিয়ে পাস করলেন।বিএ পরীক্ষাও শেষ সেমিস্টার দেবেন সামনে। আজানের আগে উঠে পড়তে বসে যান।আমি শুধু অবাক হই, এত প্রাচুর্য, এত ধৈর্য আর পরিশ্রম করার ক্ষমতা আমার মা কোথা থেকে পান!

সেদিন আমার ট্রেনিং ছিল, ভোটার তালিকা হালনাগাদের। ভাংগা মডেল স্কুলের দোতলার একটা রুমে বসেছিলাম।ব্যাগে খুচরো পঞ্চাশ-ষাট টাকার মতো ছিল।ওই সম্বল।ট্রেনিং প্রায় শেষের দিকে।আমাদের পাঁচশ টাকা করে দেওয়া হলো।টাকা বুঝে নিয়েছি, এই মর্মে স্বাক্ষর করতে না করতেই ফোন বেজে উঠলো। ভাবলাম বেরিয়ে ফোনটা ধরবো।ট্রেনিং রুমে কথা বলা ঠিক হবে না।কিন্তু বুঝতে পারছি, ভাইব্রেশন হয়েই চলছে।আমি অনুমতি নিয়ে ফোনটা হাতে বাইরে গেলাম।ওপাশে আমার ছোটবোনের কান্নায় আমার দম বন্ধ হয়ে গেলো।কিছুই বুঝলাম না, শুধু ‘আম্মু’টুকুই বুঝলাম।অন্য একজনকে ফোন দিলাম, জানলাম আমার মায়ের এক্সিডেন্ট হয়েছে।টেকেরহাটের ওইদিকে একটা জায়গায়, অটোতে ছিলেন, পিকআপ ধাক্কা দিয়ে গেছে। কী করবো আমি,কিভাবে পৌঁছাবো ভাংগা থেকে টেকেরহাট!ব্যাগে ৫৬০ টাকা মাত্র।

রাস্তা দিয়ে পাগলের মতো দৌঁড়াতে লাগলাম।উদ্ভ্রান্ত আমি।আমি ভ্যানে উঠতেও ভুলে গেছি।কাঁদছি আর দৌড়াচ্ছি।বাসস্ট্যান্ডের দিকে।কে যেন একজন আমাকে একটা ভ্যানে তুলে দিলো।আমি বাসে উঠতে গিয়ে দেখি আমাদের গাঁয়ের আরও দুই-একজন ওখানে।তারাও যাচ্ছেন টেকেরহাট। আমার মায়ের সাথে গাঁয়ের কয়েকজন ছিলেন, তাদের আপনজনেরা। আমাকে দেখে কেঁদে ফেললো।আমি তখন বুঝে গেছি আমার মা আর নেই।বুকের ভেতরটা পুড়ে জ্বলে শেষ।হাত-পা অবশ! ওরা আমাকে দেখে কাঁদলো কেন? আমার মা নেই মনে হয়।গাড়িতে বসে আল্লাহকে একটা কথাই চিৎকার করে বলছিলাম, বাবাকে নিয়ে গেছ, মা’কে প্লিজ নিও না।এ অনুভূতি বোঝানোর ভাষা আমার নেই।

আমি অসহায় ছিলাম,পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ব্যক্তি।টেকেরহাটের আগেই আমাকে নামতে বললো ফোন দিয়ে।আম্মুকে নিয়ে আসছে ফরিদপুর নেওয়ার জন্য।আমার আগেই আমার মেজ বোন, ওর স্বামী, আমার কয়েকজন আত্মীয় গাড়ি নিয়ে পৌঁছে গেছিলো আম্মুকে আনতে৷ কিন্তু আমি ভাবছি আমার মা’কে কেন নিয়ে আসছে, হয়তো মা নেই। কিছুক্ষণ পর মাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স এলো।আমি আমার মায়ের যে চেহারা দেখলাম, তা চোখের সামনে প্রতি মুহূর্তে ভাসে আজও।মাথায় ব্যান্ডেজ।রক্তে লাল।শাড়িটা ভিজে গেছে রক্তে।মুখের একপাশ বাঁকা হয়ে এক হাত ফুলে গেছে।বাড়িটা মুখে লেগেছে।আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে গেলাম ফরিদপুর হাসপাতালে।পথ যেন আর ফুরায় না।

একমাস চিকিৎসা করা হলো, মুখে একটা অপারেশন করা হলো।আমি আরও অনেক বড় হয়ে গেলাম।বিপদের দিনে আপন পর চিনলাম চূড়ান্তভাবে।

সারারাত আমার মায়ের জন্য হাসপাতালে জেগে থাকতাম, সকালে স্কুলে আসতাম।ঘুমাইনি যে কত রাত তার হিসাব মনে নেই।বিছানায় শুতাম না ভয়ে, যদি ঘুমিয়ে পড়ি! মা জেগে কিছু চাইলে বা কোনো অসুবিধা হলে যদি বুঝতে না পারি! তাই মায়ের মাথার কাছে একটা চেয়ার নিয়ে বসে থাকতাম, চেয়ারেই ঝিমিয়ে নিতাম খানিকটা সময়! মা ঘুমের মধ্যে কোনো শব্দ করেছে আর আমি টের পাইনি, এমন হয়নি একবারও। হাসপাতালের কেবিনের দেয়ালে,বাথরুমের সব আয়না ঢেকে দিলাম, যেন আমার মা নিজের মুখ দেখে ভয় না পান,কষ্ট না পান।

ওর মধ্যেই তিনি সবার খোঁজ নিতেন, খেয়েছি কি না; সবাই কেমন আছে; সব দিকে খেয়াল রাখতেন।আমার মেজ বোনকে বাজার করে বাড়ি পাঠাতাম, ও মায়ের জন্য রান্না করে খাবার পাঠাতো।বাড়ি সামলাতো।ছোটবোন দিনের বেলায় আম্মুর পাশে থাকতো, রাতে আমি। আমার মেজ বোনের বর; নিজের ভাইয়ের মতো করেছে, থেকেছে মায়ের পাশে।ছোট ভাই ঢাকা থেকে পাগলের মতো ছুটে এসেছিল, ওর হুঁশ ছিল না মায়ের কথা শুনে।ফোনটা হারিয়ে ফেললো পথেই।এলোমেলো হয়ে যায় আমাদের পরিবারের সবাই।

আমার ভাই-বোনগুলোর বিবর্ণ মুখ আমাকে শক্তি জোগাতো লড়াইয়ের। আমার মাকে বাঁচানোর লড়াইয়ে যারা আমার পাশে ছিল, তাদের কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো৷আমার স্কুলের প্রত্যেকটা মানুষ আমাকে টাকা দিয়ে, সাহস দিয়ে, সুযোগ দিয়ে চিরঋণী করে রেখেছেন।আমার মাকে আমরা ফিরে পেয়েছি আবার আমাদের মাঝে৷

সেদিন থেকে বুঝেছি, আমি আমার মাকে কতটা ভালোবাসি।সবসময় হারানোর ভয়ে বুক কাঁপে।আল্লাহ আমার মাকে সুস্থ রাখুন, অনেক বছর বাঁচিয়ে রাখুন।মায়ের দুঃখ দূর করে ছোট ছোট স্বপ্ন যেন আমরা পূরণ করতে পারি আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা সবসময়।আমাদের চার ভাই-বোনের পুরো পৃথিবী আমাদের মা।
আজ আমার সেই নতুন করে ফিরে পাওয়া মায়ের জন্মদিন!
মা, তুমি আছ বলেই
আমি আজও সম্পূর্ণ একা হয়ে যাইনি।
তুমি আছ বলেই
প্রতিরাতে দরজার ছিটকিনি পরীক্ষা না করেই, নিশ্চন্তে ঘুমুতে যাই আমি
মা, তুমি আছ বলেই
বিশ্বাস ভঙ্গের যাতনা নিয়েও হাসতে পারি
তোমার জন্যই পৃথিবীকে এখনো বাসযোগ্য মনে হয় আমার!

শুভ জন্মদিন মা