আহমেদ ইলিয়াস: বাংলাদেশের উর্দু কবি


আহমেদ ইলিয়াস

[প্রখ্যাত উর্দু কবি, সাংবাদিক, কবি আহমেদ ইলিয়াস গত ৭ জুলাই ২০২৩ ঢাকায় প্রয়াত হন।তাকে নিয়ে লিখেছেন হাইকেল হাশমী।লেখাটি গত ১৪ জুলাই দৈনিক সমকালের কালের খেয়ায় প্রকাশিত হয়।যোগসূত্রের পাঠকদের জন্য কালের খেয়ার সৌজন্যে লেখাটি প্রকাশ করা হলো। ]

বাংলাদেশে আহমেদ ইলিয়াস শেষ কবি, যিনি সমগ্র উপমহাদেশের উর্দু সাহিত্য অঙ্গনে সুপরিচিত ছিলেন। কবি আহমেদ ইলিয়াস আমার জন্য ছিলেন ইলিয়াস চাচা। তিনি আমার বাবা কবি নওশাদ নূরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর সহচর ছিলেন। যতটুকু আমার মনে পড়ে, আমি তাঁকে আমার বাবার অফিসে প্রথম দেখেছিলাম। ১৯৬৯ সালের কথা। তখন আমার বাবা ন্যাপের (ভাসানী) একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘রুদাদ’-এর সম্পাদক ছিলেন। তাঁর অফিস তৎকালীন পাক মোটর, এখনকার বাংলা মোটরে জোহরা ম্যানশনে অবস্থিত ছিল। আমি তখন বেশ ছোট এবং আমার বাবার সাথে কোনো কারণে তাঁর অফিসে গিয়েছিলাম।

ওখানে প্রথম ইলিয়াস চাচাকে দেখলাম। তাঁর নাম বাবার মুখেই শোনা ছিল। অনেক পরে হয়তো ১৯৭০ সাল হবে, আমার বাবা তখন আওয়ামী লীগের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘জরিদা’র সম্পাদক ছিলেন। জরিদার অফিস মতিঝিলে অবস্থিত ছিল ‘বাংলার বাণী’র ঠিক পাশের বিল্ডিংয়ে। ওখানে ইলিয়াস চাচাও কাজ করতেন। চাচা তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখা লিখতেন। আমি জানতাম তিনি একজন কবিও ছিলেন। উর্দু ভাষার সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কবিদের একটি বড় অংশ– যারা কাজেকর্মে আর চেতনায় স্বাধীন আর প্রগতিশীল ছিলেন। তারা মনেপ্রাণে বাঙালি জনগোষ্ঠীর সপক্ষে ছিলেন এবং তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অত্যাচারের শিকারও হয়েছিলেন।

সেই সময় আমরা মিরপুরে থাকতাম। তখন মিরপুরে অবাঙালিরা সংখ্যাগুরু ছিল। একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৫ মার্চের নৃশংসতার পরে আমার বাবা কবি নওশাদ নূরী নিখোঁজ হয়ে গেলেন। যেহেতু আমরা ওখানে আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে পরিচিত ছিলাম, তখন আমাদের বাড়িওয়ালা আমাদের বাসা ছাড়তে বাধ্য করলেন। আমাদের পরনে যা ছিল সেভাবেই আমার মা এবং আমরা চার ভাই-বোন মোহাম্মদপুরে চাচার বাসায় চলে এলাম। কয়েক সপ্তাহ পর আমার বাবার খোঁজ পাওয়া গেল, তাঁকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আটকে রেখেছিল। আমার চাচা তাঁর প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে মুক্ত করে নিয়ে এলেন। দুই মাস পরে আমরা আসাদগেটের কাছে নিউ কলোনিতে একটি বাসায় চলে গেলাম। ওখানে একটি ফ্ল্যাটে ড. কুদরাত-এ-খুদাও থাকতেন। ডিসেম্বর মাসে যখন মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব শুরু হলো, তখন এই এলাকাটি শেরেবাংলা নগরের কাছে হওয়ায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর টার্গেটে ছিল। এখানে বম্বিংয়ের অনেক শব্দ হতো। তাতে আমরা ভাইবোন সবাই বেশ আতঙ্কে থাকতাম। তাই একদিন বাবা বললেন আমরা ইলিয়াসের বাসায় চলে যাব। ওখানে হয়তো শব্দ কম শোনা যাবে।

চাচার বাসা তখন নুরজাহান রোডের এক কোনায় ছিল। পরের দিন আমরা সবাই ইলিয়াস চাচার বাসায় চলে গেলাম। চাচার পরিবারে চাচি ছাড়াও তাদের পাঁচ ছেলেমেয়ে ছিল। তারা আমাদের সানন্দের সাথে গ্রহণ করলেন। আমরা তাঁর বাসায় খুব বেশিদিন থাকতে পারিনি। হয়তো এক সপ্তাহ থেকেছিলাম। তারপর দেশ স্বাধীন হয়ে গেল এবং আমরা সবাই উদ্বাস্তুর মতো, আমার বাবার আরেক বন্ধু ফাতেহ ফারুক চাচার বাসায় সলিমুল্লাহ রোডে চলে গেলাম। ভাগ্যের কী পরিহাস, প্রথমে অবাঙালিরা বাঙালি সমর্থক বলে বাসা থেকে বের করে দিয়ে বাসা লুট করে নিল। স্বাধীনতার পরে অবাঙালি বলে আবারও বাসা লুট হলো।

আমি এটাকে মজা করে ‘ডাবল ডিলাইট’ বলতাম। ফাতেহ চাচার বাসায় একটি রুমে আমাদের পরিবার আর ইলিয়াস চাচার পরিবার প্রায় এক বছর একসাথে ছিলাম। ওই সময় চাচাকে কাছে থেকে দেখার আর বোঝার সুযোগ হয়েছিল। তিনি একজন নরম প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কোনোদিন তাঁকে উচ্চ স্বরে কথা বলতে শুনিনি, কোনোদিন রাগ করতে দেখিনি। তিনি শিশুদের প্রতি খুবই স্নেহশীল ছিলেন আর নিজের পরিবারের প্রতি ছিলেন অনেক যত্নশীল। তাঁর সারাটি জীবন কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেছে। আমরা যখন ১৯৭২ সালে একসাথে থাকতাম, তখন দেখেছি তিনি কেমন পরিশ্রম করতেন। তাঁর একটি ছেলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে তার চোখের দৃষ্টি হারিয়ে গেল। সে প্রায় বিকল হয়ে গিয়েছিল। চাচা ধার করে, মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে তার যথাসাধ্য চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাকে নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন কিন্তু নিয়তির কাছে হেরে গেলেন। চাচার পরিবার বেশ বড় ছিল, তিন ছেলে আর পাঁচ মেয়ে।

ছেলেদের মধ্যে বড় ছেলে ২৩-২৪ বছর বয়সে মারা গেল। এত দুঃখ, দুর্দশা, প্রতিকূলতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি জীবনযুদ্ধের সাথে সাথে তাঁর সাহিত্যচর্চা চালিয়ে গেলেন। ১৯৩৪ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো জীবন ছিল সংগ্রামে পরিপূর্ণ। তাঁর জন্মের কয়েক দিন পর তাঁর মা মারা যান। একজন প্রতিবেশী মহিলা তাঁকে পালক নেন। কিন্তু ছয় মাস পর তাঁর পালক বাবা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে আবার তাঁর নিজের বাবার কাছে ফিরে আসতে হলো; যিনি এরই মধ্যে আরেকটি বিয়ে করেছিলেন। সৎমা তাঁর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। খুব অল্প বয়সে সৎমায়ের কারণে তাঁকে ছোটখাটো কাজ করতে হয়েছিল। যেমন– দোকানে কাজ করেছেন, ফেরিওয়ালা হয়েছেন, নাইটগার্ডের কাজ করেছেন। তিনি ভালো ছাত্র ছিলেন কিন্তু কাজ করতে গিয়ে পড়াশোনায় মন দিতে পারেননি। পরে তিনি ঢাকায় প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এরপর আইএ পাস করেন। ম্যাট্রিক পাস করার পরপরই তিনি তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। প্রথম কাজ ছিল পাকিস্তান ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগে জরিপকারী হিসেবে।

১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা প্রেস ক্লাবে ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। তখন থেকেই তিনি সাংবাদিকতা পেশার সাথে সংযুক্ত হলেন। আমার সৌভাগ্য যে আমি তার সাথে একটি এনজিওতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। যেখানে তিনি সংস্থার প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করতেন আর সব সময় তাঁর কমিউনিটির উন্নয়নের কথা চিন্তা করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে কমিউনিটি পথভ্রষ্ট হয়েছিল। তাঁর ধারণা ছিল তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভেদাভেদ সৃষ্টি করার জন্য তাদের ব্যবহার করেছিল। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে এই সম্প্রদায়ের ভাগ্য এই দেশ আর মাটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমি তার সাথে এক বছর কাজ করেছিলাম। এরপর আমাদের কর্মজগৎ ভিন্ন হয়ে গেল। কিন্তু তিনি আমাকে তাঁর প্রিয় প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করতে দেননি, আমাকে তাঁর উপদেষ্টা বোর্ডে রেখেছিলেন। আমি তাঁর সাহিত্যিক দক্ষতা সম্পর্কে মন্তব্য করার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি নই।

তবে তাঁর কবিতা আর রচনাবলির খুব ভক্ত। আমার মনে আছে, যৌবনকালে ডায়েরিতে আমি তাঁর কবিতা লিখে রাখতাম। পরে এই কবিতাগুলো আমি কোনো আলোচনায় অথবা চিঠিপত্রে ব্যবহার করতাম। বিখ্যাত প্রগতিশীল উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁকে তাঁর পত্রিকা, ‘লায়ল ও নাহার’-এর সম্পাদকমণ্ডলীর চারজনের একজন নিয়োগ করেছিলেন। এতেই প্রমাণ হয় যে তিনি কত বড় মাপের কবি ছিলেন। একজন বড় মাপের কবি ছিলেন তা প্রমাণ হয় যে ফয়েজ এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ইলিয়াস চাচা তাঁর জীবদ্দশায় ছয়টি কবিতা সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়া আরও ৯টি বই প্রকাশ হয়েছিল। যার মধ্যে সাতটি বই ইংরেজি ভাষায় রচিত– এর মধ্যে একটি তাঁর আত্মজীবনী। তিনি দেশ-বিদেশে বহু সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। অনুবাদক জাভেদ হুসেন তাঁর নির্বাচিত কবিতার একটি সংকলন বের করেছেন। সাহিত্য পত্রিকা ‘মনন রেখা’ তাঁর ওপর একটি বিশেষ সংখ্যা বের করেছে ২০২০ সালে।

ইলিয়াস চাচার কবিতায় বিষয়বস্তু হিসেবে জীবনের আনন্দ-বেদনা, চাওয়া-পাওয়া, মিলন-বিরহ, দেশ বিভাগ-দেশান্তর– এসব প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি তাঁর মাকে নিয়ে একটি আবেগপূর্ণ কবিতা লিখেছিলেন, যেটা আমি অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলাম। কবিতাটি হলো– মা আমার মা কেমন ছিল আমি জানি না, সে দেখতে কেমন ছিল আমি তাও জানি না, আমি আমার মাকে দেখিনি কোনোদিন শুনেছি আমার জন্মের কিছুক্ষণ পরে স্বর্গ থেকে তাঁর ডাক এসেছিল সে হয়ে গেল স্বর্গবাসী। লোকে বলে, মায়ের পায়ের নিচে আছে স্বর্গ যার তুলনা নেই ত্রিভুবনে, বন্ধুরা আমাকে বলে দাও কোথায় পাবো ওই চরণ দুটি, যেখানে রয়েছে নিহিত আমার স্বর্গ কোথায় আছে আমার স্বর্গ? তাঁর আরেকটি কবিতা, যেটি আমি অনুবাদ করেছিলাম আর আমার বন্ধু কায়সার হক আবৃত্তি করেছিল।

সেই কবিতাটি হলো– সৃষ্টির নবভ্রমণ বলা হয় এই ভূমিতে আমার জন্ম হয়েছিল ধবধবে বিশুদ্ধ কাগজের গর্ভ থেকে। ঘুমের ভিতরে হাসা, ঘুম থেকে আচমকা উঠে যাওয়া আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকা, চুপ করে বসে থাকা কোলাহলে মাতা, কাঁদা, অরণ্যে অরণ্যে ঘুরে বেড়ানো শব্দের সব রং আমার আপন ছিল। দিন অতিবাহিত হবার সাথে সাথে– শব্দের সব রং থেকে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হলো সেই শব্দ যে আমাকে পরিচয় দান করেছিল আমি সেই শব্দগুলো থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। এখন আমি ভ্রমণরত গর্ভে আমার নিঃসঙ্গতার আতঙ্ক লুকিয়ে ওই মুহূর্তের দিকে যেখানে থাকা সব দুঃখ শুধুই আমার। দীর্ঘ অসুস্থতার পর কবি আহমেদ ইলিয়াস, প্রখ্যাত উর্দু কবি আর সাংবাদিক গত ৭ জুলাই ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন, আমিন।