কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতা ভবিষ্যৎ কবিতার অজানা সড়ক ॥ মতিন বৈরাগী


[ কাজী জহিরুল ইসলাম। কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, ভ্রমণ লেখক। বলা যায় তিনি বহুমাত্রিক লেখক। শুক্রবার (১০ ফেব্রুয়ারি) তার ৫৬তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে কাজী জহিরুল ইসলামকে নিয়ে কবি মতিন বৈরাগীর নিবন্ধ যোগসূত্রের পাঠকদের জন্য তুলা ধরা হলো।-সম্পাদক ]

এখনতো আকাশের স্ট্রিটে হাঁটে ডিজিটাল নারদ
ইথারের ওভেনে সেদ্ধ হয় বাতাসের ডিম
রাত্রির বাগানে ফোটে ছোট ছোট দীর্ঘাশ্বাস
অন্ধকারের ফরাশ বিছিয়ে বসেন-ই পীর

সময়ের এই প্রস্থে মানুষের ভাবনায় যে নতুন অনুষঙ্গ উপস্থিত; মানুষের যে ভাবনাবাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার দৃশ্যগুলোতে প্রবেশ করছে তা দেখতে পাচ্ছেন কবি ‘আকাশের স্ট্রিটে হাঁটে ডিজিটাল নারদ’ কবিতার মধ্য দিয়ে।সভ্যতার নতুন যাত্রায় টেকনোলজির যে উৎকর্ষতা মানুষকে নিয়ে চলেছে তার জ্ঞাত জগৎ থেকে, তার চারপাশ থেকে আরেক জগতে, যা মানুষের মনের জগতের হ্যালুসিনেশনের মতো‌ বাস্তব ও অবাস্তবের সংকট, আর তাতে ভাবনার গতি দ্বিধা ও দ্বিরুক্তির ভেতরে প্রকাশিত হয়ে পড়ছে এলোমেলো এক কল্পনায় যা সত্য নয় তবু যেনো এমন এক প্রকাশ যে সত্য হলে হতেও পারে।ডিজিটাল নারদ, মিথের নারদের চারিত্রিক বৈশিষ্টগুলোকে ইলেক্ট্রন জগতে এনে তার সমতাকরণ আর অলিক ভোঁজবাজির মতো একটা মনের সংকট নানা প্রতীকে বিস্তারিত যার অস্তিত্ব আছে বস্তুজগতে বস্তুর মতো কিন্তু ভাবনায় আছে, পরিমিতিহীনতায় আছে, অপরিমিতির মধ্যে আছে একটা অভাবিত প্রকল্পে তখনি কেবল ‘ইথারের ওভেনে সেদ্ধহয় বাতাসের ডিম’।

এই পঙক্তি কাব্যিক হয়ে ওঠে জীবনযাপন প্রণালীর মধ্যে এবং ‘রাত্রির বাগানে’তখন ‘ফোটে ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস’ আর ‘অন্ধকারের ফরাশ বিছিয়ে বসেন ই-পীর’।এই কল্পনায় বাস্তবের অগ্রগতি এবং মনোজগত এই দুইয়ের একটা বিধান রয়েছে।তিনিই একালের মোড়ল, নিয়ন্ত্রক,তিনিই বহুজাতিক কোম্পানি, নানা চেহারায় আবির্ভূত। তার কেরামতিতে আমরা দেখি ‘দুধভরা ওলান ঝুলিয়ে হাঁটে বরফের গাই, মুখ দেয় সেল্যুলার ঘাসে’ তারপর‘কষ্টের টুথব্রাশে দাঁত মেজে’ আমরা ‘স্নেহের ঝাপটা দিই চোখে-মুখে’।‘সারাদিন পার করি স্বপ্নের জামায় বোতাম লাগাতে লাগাতে’।‘রৌদ্রের ঠোঙায় করে’ তখন ‘সিঙারা কিনে আনে মেঘের ছেলেরা’ আর ‘বিকেলটাকে ল্যাঙমেরে সন্ধ্যাবাবু ধুতি গুটিয়ে বসেন চিন্তার ছাদে’।‘উরু ফাঁক করে’ তখন‘শুয়ে পড়ে রাত্রি’, অসহায় অথবা বারবনিতা, এক বাধ্যবাধকতার নিয়মে আবদ্ধ।

যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, কি হলো? কবিতা কি এমন? এর কি অর্থ হয়? কবিতা কি অর্থহীন প্রলাপ? কিন্তু যদি নিবিষ্ট হয়ে আমরা পাঠে বসি এবং এই বয়ানগুলো আমাদের চলমান চেতনায় নিয়ে মিলিয়ে দেখি তা হলে দেখবো যে বলারভঙ্গিতে রয়েছে এক জাদুকরি মোহমায়া, যা ছড়িযে রয়েছে বাস্তবেও।এটাই কি জাদুবাস্তবতা নয়? এই কবিতা আমাদের হাতছানি দেয়, নানা ভাবে প্রলোভনে ফেলে এবং আমাদের লুট করে; আমরা কষ্টের ‘টুথব্রাশে দাঁত মাজি’ ‘স্নেহের ঝাপটা দিই চোখে-মুখে’ আর স্বপ্ন দেখি,‘সন্ধ্যাবাবু ধুতি গুটিয়ে বসেন চিন্তার ছাদে’।দিন ফুরায়। ‘উরু ফাঁক করে শুয়ে পড়ে রাত্রি’।এসব নানা দৃশ্যহীনতার ভেতর এক দৃশ্য যা আমরা বুঝিনা কিন্তু বুঝি, যা তৈরি করে এক ঘোরের জগত।

কবিরা আগামীর কবিতা কেমন লিখবেন এর একটা আন্দাজ আমরা ‘আকাশের স্ট্রিটে হাঁটে ডিজিটাল নারদ’ কবিতাটি থেকে অনুমান করে নিতে পারি।এই কবিতাটি নানা ভাবনা দিশা বিদিশার সাথে আমাদের যুক্ত করে।কাজী জহিরুল ইসলাম হয়ত নিজের অজান্তেই নির্মাণ করেছেন ভবিষ্যৎ কবিতার অজানা সড়ক।

দেখো ভিনিয়াস, দেখো লিথুনিয়া
দেখো প্রিয় জন্মভূমির অনুর্বর ধুলিকণা
শীতল উপত্যকা এবং আধুনিক মস্কো
দেখো জেনারেল উইন্টারের দেশ
তোমাদের পাথরের চোখগুলো মেলে ধরো
দেখো কী বিভৎস দাঁতাল শুয়োরের দল
আমার গলায় বসিয়েছে ইস্পাতের দাঁত
অথচ মুখে ওদের ভুবন ভুলানো হাসি
গণতন্ত্রের ব্যাপক আস্ফালনে
প্রিয় পিত্রিভূমির গলায় ওরা ঝুলিয়ে ভিক্ষার বেশাতি…
হে দেশবাসী তোমরা আবার কমরেড হও
এবার সত্যিকিারের কমরেড..[ লেনিনের ভাষণ ]

এই কবিতাটি ১৯৯৭ সালে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পার্টির মুখপত্র ‘একতা’য় বিশেষ ভাবে ছাপা হয়।গদ্যের লিরিকে বলিষ্ঠ এক বক্তব্য যার আবেগগুলো পরিমিতির মধ্যে ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ছে আর কবিতা হয়ে উঠছে এক কমরেডের বিদায় ভাষণ যার প্রান্তগুলো একই কেন্দ্রমূখি এবং যখন বলেন ‘বিদায় আজারবাইজানের উষ্ণ মরুভূমি/বিদায় সাইবেরিয়ার দুর্ধর্ষ জেনারেল/ওয়াশিংটনের পায়ে মস্তক নোয়ানো অতি সভ্য মস্কো তোমাকেও বিদায়’।এই ভাষণভাব কবিতায় যে আবেগ তা যেনো সমপুষ্টি নিয়ে বসে গেছে কবিতাটির গায়ে, নির্মাণের বিশেষগুণে। এখানেও সেই এক ঈশ্বর ‘আনন্দ উৎসবে মেতেছে হোয়াইট হাউজ’ দ্বারা স্পষ্টতই তার ভূমিকা এবং বিজয়ের বিষয়টি আর আলগা থাকেনি। কবি যা অনুভব করেছেন তা’ অনুভব করতে পারেননি আমাদের প্রগতিবাদীগণ পতনের আওয়াজে ছাতাটা বুজিয়ে খুঁজছেন ঈশ্বর, মানে ধনী, প্রভু, রাজা,স্বামী,অধিপতি যিনি অপরকে অধীন করেন ।

‘মঙ্গলময় ঈশ্বর’ এ তিনি বলেন’ ‘মানুষগণ, তোমরা শোন এবং বিশ্বাস করো’ এখানেও বিবৃতিগুলো আবেগদীপ্ত এবং সম্মোহনপূর্ণ। এখানে ঈশ্বর বসবাস করেন মাটির ঘরে, তিনি কোন দৈববাণী পাঠান না ‘এই যে এই মাটির ঘরে/মৃত্তিকা বেষ্টিত এই পরিপাটি ঘরেই তার বসবাস’ এবং তিনি এই ঈশ্বরকেই নিজের ঈশ্বর বলে মানছেন এবং বলছেন ‘আমার ঈশ্বর প্রেরণ করে না কোনো দৈববাণী/ক্রোধের লা’নাত ছুড়ে পোড়ায়না অবিশ্বাসীদের ফসলের মাঠ’ এই অভিজ্ঞতা তার কর্মউপলক্ষ ভ্রমণ থেকে কুড়াণো অভিজ্ঞতা যা তিনি দেখেছেন বসনিয়ায়, কসোভোতে, দেখেছেন অফ্রিকায়, এশিয়ার নানা দেশে।আর কবিতাটি শেষ হয়েছে ‘আমার ঈশ্বর হাসে, নিষ্পাপ নির্মল হাসি’র মতো নিটোল পঙক্তিতে।

‘আমাদের বুকে পা রেখে মঞ্চে ওঠেন মহান ঈশ্বর
আমরা ঈশ্বরের পায়ে চুমু খেয়ে
প্রার্থনার সংগীতে মগ্ন হই
ঈশ্বর তুমিও তৈরি থেকো
একদিন আমরাও মঞ্চে উঠব
মানুষের ভার তোমাকেও বুক পেতে সইতে হবে’ [পারিবর্তন]

কিংবা
শাসকেরা মিথ্যার বেশাতি ফেরি করে প্রতিদিন।
আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়ি তবু ব্যালটের বাক্সে
গণতন্ত্র গণতন্ত্র তসবিহ জপি সারাক্ষণ
স্বপ্নের স্বদেশ! প্রত্যাশার আলো ক্রমশই ক্ষীণ
মরে যেতে যেতে বলি স্বপ্ন একটুকরো থাক সে
হৃদয়ের খুব কাছে তবু, সুখের অনুরণন। [হতাশা নগর ]

এই যে প্রতিদিনের মৃত্যু, প্রতিদিনের এক প্রবঞ্চনার মধ্যে জীবনযাপন, এ যেনো এক নিয়তি যাকে বহন করে চলেছে একদল মানুষ। তারা প্রতারিত, প্রবঞ্চিত এক দাস্যজীবনের বোঝা টানছে।
ভালো কবিতার জন্য দরকার অভিজ্ঞতা, বিশ্বকে জানা, নিজের মধ্যে তার মগ্নতার অধিষ্ঠান তৈরি করা, প্রকাশে উপযুক্ত ভাষাকে বাহন করা, তা হলেই ভাষা আভিধানিক অর্থ থেকে বেরিয়ে এসে নতুন অর্থের দ্যোতনা দেয় পাঠকের মনে।সেরকম অনেক কবিতা রয়েছে কাজী জহিরুল ইসলামের।নানা অভিজ্ঞতার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে তার কবিতায়, রয়েছে গম্ভীর বাক্যবিন্যাস, চমৎকার সব উপমার ব্যবহার এবং মাপা ছন্দের কাজ।কাজী জহিরুল ইসলাম মানবিকতার পক্ষের কবি, মানুষই তার কাছে হয়ে উঠেছে দীপ্তিমান ঈশ্বর আর তা এ কারণে যে বহুজাতিক অর্থনীতি, এককেন্দ্রিক বিশ্বপরিকল্পনা যে ঈশ্বরের ভূমিকা নিয়েছে তা রুখতে মানব ঈশ্বরের জাগরণ অনিবার্য।এই বাণীই ব্যপ্ত হয়েছে কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতায়।বহু বছর আগে তার সম্পর্কে কবি আল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ কবি-তারুণ্যকে আমি প্রবাসে দেখতে পাচ্ছি’।পঞ্চাশের আরেক প্রধান কবি শহীদ কাদরীকেও দেখি কবি কাজী জহিরুল ইসলাম সম্পর্কে ‘বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবির উন্মেষ’ বলে উচ্ছসিত হতে।